বৃহস্পতিবার

২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯ আশ্বিন, ১৪৩৩

ককটেল ফোটালেই ৫ হাজার টাকা, যোগাযোগে ভারতীয় নম্বর: ডিবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৩২

শেয়ার

ককটেল ফোটালেই ৫ হাজার টাকা, যোগাযোগে ভারতীয় নম্বর: ডিবি
ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিটি মলোটভ ককটেল বা হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভিডিও পাঠালে চক্রের সদস্যদের ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। এসব অপকর্মের নির্দেশনা আসছে ভারতীয় নম্বর ব্যবহার করে খোলা বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে।

গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে নাশকতার তথ্য

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রাজধানীতে ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সম্প্রতি গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ভারতে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এসব নাশকতার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

মাঠপর্যায়ে ককটেল নিক্ষেপের জন্য মাদকাসক্ত ও ভাসমান মানুষদের ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি দলীয় পদ-পদবির লোভ দেখিয়েও তরুণদের এসব অপরাধে যুক্ত করা হচ্ছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড ও রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় ককটেল তৈরির গোপন কারখানার সন্ধান পেয়েছে পুলিশ।

ককটেল বিস্ফোরণে গ্রেপ্তার একাধিক ব্যক্তি

সাম্প্রতিক অভিযানগুলোতে ডিবি একাধিক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। এর মধ্যে গত ১৮ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল হামলার ঘটনায় বংশাল থানা ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিটের দপ্তর সম্পাদক রায়হান উদ্দিন, ছাত্রলীগ কর্মী রাসেল খান, আলা উদ্দিন ও আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়।

একই দিন যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ দুনিয়া কাঁচাবাজার এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ১০টি হাতবোমা উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়া গত ১৯ সেপ্টেম্বর কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় শাহজাহানপুর থানা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও যুবলীগ কর্মী মোহাম্মদ সানমুনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান ফটকের সামনে বোমাবাজির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফকে মোটরসাইকেল ও ককটেলসহ গ্রেপ্তার করা হয়।

বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠালেই মিলত টাকা

ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার রায়হান জানান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেনের নির্দেশে তারা যাত্রাবাড়ীতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তারা পরিচিত এক দোকানদারের মোটরসাইকেল নিয়ে সেটি ব্যবহার করেন।

বিস্ফোরণের পর ভিডিও ধারণ করে নির্ধারিত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠালেই মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যেত বলে জানান রায়হান।

ভারতীয় নম্বর মানেই ভারতে অবস্থান নয়

ডিবি ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার মোল্লা মো. শাহীন ও ডিবি প্রধান শফিকুল ইসলাম জানান, অপরাধীরা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করছে।

তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সতর্ক করে বলেছেন, শুধু ভারতীয় নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে বলেই ব্যবহারকারী ভারতে অবস্থান করছেন, এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। রোমিং সুবিধা বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকেই এসব অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করা সম্ভব।

ভারতীয় নাগরিকসহ আরও দুজন গ্রেপ্তার

এদিকে, নাশকতার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার সন্দেহে গত সোমবার রাতে ঢাকার উত্তরা থেকে রবিউল ইসলাম নামে এক ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে ডিবির রমনা জোনাল টিম। তার পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্সে তথ্যের গরমিল থাকায় তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

অন্যদিকে, কক্সবাজার থেকে বাস পোড়ানো ও বোমাবাজির সমন্বয়ক ডেমরা থানা মৎস্যজীবী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সবুজকে গ্রেপ্তার করেছে ডেমরা থানা পুলিশ।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার থাকার কারণেই অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হচ্ছে। নাশকতার মূল নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।