বুধবার

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

দেড় লাখ কোটি টাকা খরচ, তবু পিছিয়েছে রেলওয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৩৪

শেয়ার

দেড় লাখ কোটি টাকা খরচ, তবু পিছিয়েছে রেলওয়ে
ছবি সংগৃহীত

গত ১৭ বছরে রেলওয়ের উন্নয়নে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হলেও পণ্য পরিবহনে ২০ বছর এবং যাত্রী পরিবহনে পাঁচ বছর পিছিয়েছে সংস্থাটি। এ সময়ে পণ্য পরিবহন কমেছে ৬৫ হাজার টন এবং যাত্রী কমেছে প্রায় দুই কোটি।

নতুন রেললাইন নির্মাণ ও স্টেশন আধুনিকায়নে জোর দেওয়া হলেও লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিন সংকটে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ট্রেন চালানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সাড়ে আট ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে মালবাহী ট্রেনের সময় লাগছে ৭২ ঘণ্টা। যাত্রীদের মধ্যেও রেলসেবা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, অতীতে লাইন সম্প্রসারণ করা হলেও ইঞ্জিন এবং স্টেশন আধুনিক করা হলেও বগি কেনা হয়নি। এসব কারিগরি জটিলতা নিয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশন মামলা করেছে।

তিনি জানান, ব্রডগেজ লাইনে আগামী এক বছরের মধ্যে ইঞ্জিনস্বল্পতা সমাধানের চেষ্টা চলছে। মিটারগেজের সংকট কাটাতেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বড় বিনিয়োগের পরও কমেছে পণ্য পরিবহন

রেলওয়ের ২০০৮-০৯ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, ১০৯টি সমাপ্ত ও চলমান প্রকল্পে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চল রেলওয়েতে বিনিয়োগ হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।

২০০৬-০৭ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে ৫ লাখ ৭৪ হাজার টন পণ্য পরিবহন করেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ৫ লাখ ৮ হাজার টনে নেমেছে।

গত ২৩ বছরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে রেলপথে ৭০ হাজার কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছিল। বর্তমানে তা কমে ৪৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৭ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে রেলওয়ের আয় হয়েছিল ১৯৭ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে আয় হয়েছে ৬৭ কোটি ৯ লাখ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে আয় কমেছে ৬৬ শতাংশ বা ১৩০ কোটি টাকা।

২০২১-২২ অর্থবছরে রেলওয়ে সর্বোচ্চ ১ লাখ কনটেইনার এবং প্রায় ১৬ লাখ টন পণ্য পরিবহন করে ১১৪ কোটি টাকা আয় করেছিল। পাঁচ বছরের ব্যবধানে কনটেইনার পরিবহন কমেছে ৫৮ শতাংশ এবং পণ্য পরিবহন ৬৭ শতাংশ।

একসময় রেলপথে সার, পাথর ও খাদ্যশস্য পরিবহন লাভজনক ছিল। গত দুই অর্থবছরে এই তিন ধরনের পণ্য পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ হাজার ২৬২টি ওয়াগনে খাদ্যশস্য পরিবহন করা হলেও সর্বশেষ অর্থবছরে তা ৯৮ শতাংশ কমে ১২০টি ওয়াগনে দাঁড়িয়েছে।

জ্বালানি তেল পরিবহনও কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার ওয়াগন তেল পরিবহন করা হয়েছিল। সর্বশেষ অর্থবছরে তা কমে ৭ হাজারে নেমেছে।

পণ্যবাহী ট্রেনে কমেছে ইঞ্জিন বরাদ্দ

পণ্য পরিবহনে প্রতিদিন গড়ে ১৩টি ইঞ্জিন প্রয়োজন। ২০২২-২৩ অর্থবছরেও প্রতিদিন ১২টি ইঞ্জিন পণ্যবাহী ট্রেনে যুক্ত ছিল। তবে যাত্রীবাহী ট্রেনকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য ইঞ্জিন কমানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসে সারা দেশে পণ্য পরিবহনের জন্য প্রতিদিন গড়ে মাত্র দুটি ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ইঞ্জিন সংকটের কারণে চট্টগ্রাম গুডস পোর্ট ইয়ার্ডে কনটেইনার আটকে থাকছে। ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সিজিপিওয়াই থেকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডির উদ্দেশে ৪৮ হাজার কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছিল। তখন আটকে ছিল ২ হাজার কনটেইনার।

২০২৫ সালে আইসিডিগামী কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা কমে ২৮ হাজারে দাঁড়ায়। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পরিবহন করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কনটেইনার। দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ এবং কনটেইনার বাণিজ্যের ৯৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়।

ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রতিদিন অন্তত চারটি ইঞ্জিন প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে এক থেকে দুটি। কখনো টানা দুই-তিন দিন ট্রেন চলাচল করে না। চট্টগ্রাম বন্দরে ১৫ থেকে ২০ দিন পর্যন্ত কনটেইনার আটকে থাকায় শিপিং এজেন্টরা বিলম্ব মাশুল চাপাচ্ছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির কারণে ব্যবসায়ীরা রেলপথ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

পাঁচ বছরে যাত্রী কমেছে প্রায় দুই কোটি

রেলওয়ের ২০২৪ সালের ইনফরমেশন বুকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে রেলপথে যাত্রী পরিবহন করা হয় ৬ কোটি ৫৩ লাখ ৩১ হাজার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা সর্বোচ্চ ৯ কোটি ২৭ লাখ ৫ হাজারে পৌঁছায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যাত্রীসংখ্যা কমে ৭ কোটি ৪১ লাখে নেমে আসে। পাঁচ বছরের ব্যবধানে যাত্রী কমেছে ১ কোটি ৮৫ লাখ ৯১ হাজার।

২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাবে রেলওয়ের ২৮৯টি ডিজেল ইঞ্জিনের মধ্যে ৮২টি বিকল ছিল। এর মধ্যে ব্রডগেজের ২৪টি এবং মিটারগেজের ৫৮টি ইঞ্জিন রয়েছে।

এদিকে রেলওয়ের জনবলও কমেছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সংস্থাটিতে ৩০ হাজার ৪৪৪ জন কর্মী ছিলেন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ সংখ্যা কমে ২৪ হাজার ১৩১ জনে দাঁড়িয়েছে। রেলকর্মীদের বড় সংখ্যায় নিয়োগের ঘটনা কমে গেলেও স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি মাসে কর্মীরা অবসরে যাচ্ছেন। জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে ছোটখাটো পদেও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। রেলে পোষ্য কোটায়ও একটি বড় অংশ নিয়োগ হয়।

গবেষণায় যাত্রীসেবার বিভিন্ন ঘাটতির চিত্র

২০২৫ সালে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকদের পরিচালিত বিভিন্ন রুটের ৫২৫ জন যাত্রীর ওপর করা জরিপে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার বিষয়টি উঠে আসে। জরিপে যাত্রীরা কালোবাজার থেকে টিকিট কেনার বাধ্যবাধকতা, প্ল্যাটফর্মের অসমান উচ্চতা, বগিতে অতিরিক্ত ভিড়, নিম্নমানের খাবার ও পাথর নিক্ষেপের মতো ঘটনায় অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন।

একই বছর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের করা আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ৬৬ দশমিক ৪ শতাংশ যাত্রী অনলাইনে টিকিট কাটার সময় পেমেন্ট জটিলতায় পড়েছেন। ৩৭ শতাংশ যাত্রী উৎসবের সময়ে সার্ভার ক্র্যাশের কথা জানিয়েছেন। ৫৯ শতাংশ যাত্রীর মতে, কাস্টমার সাপোর্ট সন্তোষজনক নয়।

২০২৩ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের বিভিন্ন অবকাঠামোগত ত্রুটি উঠে আসে। ২০০৩ সালে আধুনিকায়ন করা হলেও প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনের বগির দরজার মধ্যে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি উচ্চতার পার্থক্য রয়েছে।

স্টেশনের তিনতলা ভবনে লিফট বা র‌্যাম্প না থাকায় বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ওপরের তলা ব্যবহার করতে পারেন না। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ট্যাকটাইল টাইলস নেই। বসার পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় যাত্রীদের মেঝেতে প্লাস্টিক বা মাদুর বিছিয়ে বসতে হয়।

স্টেশনের লাগেজ ট্রলিগুলো কুলি সিন্ডিকেটের দখলে থাকায় যাত্রীরা নিজেরা তা ব্যবহারের সুযোগ পান না এবং কুলিরা অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ডে ট্রেনের তথ্যের পরিবর্তে বিজ্ঞাপন প্রচারের কারণেও যাত্রীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

চট্টগ্রাম-সিলেট রুটের নিয়মিত যাত্রী ডা. হামিদ হোসাইন আযাদ জানিয়েছেন, অনলাইনে টিকিট দ্রুত শেষ হলেও কালোবাজারে তা পাওয়া যায়। এসি বগিতেও দাঁড়িয়ে যাত্রী নেওয়া হয় এবং অর্থের বিনিময়ে রেলওয়ের কর্মচারীরা অবৈধ যাত্রী তোলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে।

নতুন ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম ইঞ্জিন সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুটি প্রকল্পের আওতায় ৪০টি ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০টির দরপত্র আহ্বান করা হবে।

মিটারগেজ লাইনের ইঞ্জিন পাওয়া কঠিন উল্লেখ করে তিনি জানান, বিশ্বে এখন মিটারগেজ লাইন না থাকায় এ ধরনের ইঞ্জিন সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। দরপত্রের পর ইঞ্জিন উৎপাদন করে আনতে কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে। নতুন ইঞ্জিন না আসা পর্যন্ত পুরনো ইঞ্জিন দিয়েই পণ্যবাহী ট্রেন চালু রাখার চেষ্টা চলছে।