সোমবার

২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৬ আশ্বিন, ১৪৩৩

একের পর এক আগুন দুর্ঘটনা নাকি নাশকতার ছক?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:৪২

শেয়ার

একের পর এক আগুন দুর্ঘটনা নাকি নাশকতার ছক?
ছবি বাংলা এডিশন

প্রথমে দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প এলাকায় আগুন, আর এখন দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি আয়ের খাত গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ককটেল বিস্ফোরণ, বাস ও ট্রেনে অগ্নিসংযোগের অভিযোগও রয়েছে।

একের পর এক দুর্বৃত্তদের এসব অরাজকতাকে সামনে রাখলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও গার্মেন্টসে অগ্নিকাণ্ড কি নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে দেশকে অস্থিতিশীল করার কোনো গভীর ষড়যন্ত্র?

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে আগুন

জানা যায়, চলতি মাসেই দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের পাইওনিয়ার বেজের একটি অস্থায়ী ভবনে ঘটে অগ্নিকাণ্ড। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ভোরে ওই ভবনে আগুনে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সার্ভার রুমসহ বেশ কয়েকটি কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পুড়ে যায় কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও ইন্টারনেট সার্ভারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।

আশুলিয়ায় প্রীতি গ্রুপের কারখানায় অগ্নিকাণ্ড

রূপপুরের এই অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানা চত্বরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেশের সচেতন মহলে জন্ম নেয় নানা প্রশ্ন। তথ্য বলছে, একাধিক বিকট বিস্ফোরণের পরই চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আগুন। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারখানা চত্বরে থাকা একাধিক যানবাহনও।

জানা যায়, ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিটের প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। পরবর্তীতে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি বেশ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হয় বলেও, তথ্য পাওয়া যায়। ফায়ার সার্ভিসের দাবি কাভার্ড ভ্যানে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার থেকে আগুনের সূত্রপাত।

কিন্তু এই ঘটনাকে শুধু কি একটি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলেই উড়িয়ে দেয়া যায়? নাকি সম্প্রতি দুর্বৃত্তদের ঘটানো একের পর এক অরাজকতার আড়ালেই রয়েছে, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে আগুন লাগার কোনো গভীর যোগসাজশ?

ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর অরাজকতার অভিযোগ

গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর), জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

ঠিক তার পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই রায়কে ঘিরে দেশজুড়ে এক ভয়াল অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রে মাঠে নামার অভিযোগ ওঠে আত্মগোপনে থাকা কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।

সেসময় সংগঠনটির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিও দেখা যায়, যেখানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ ‘ক্যাঙ্গারু কোর্ট’ আখ্যা দেয় আওয়ামী যুবলীগ।

যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নির্দেশে সেই বিজ্ঞপ্তিতে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এই লকডাউন ঘোষণার আড়ালেই রাজধানী ঢাকাকে অচল করে দেয়ার এক ভয়াল নকশা রচিত হয়েছিল—এমন অভিযোগও সামনে আসে।

ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের ধারাবাহিকতা

তথ্য বিশ্লেষণে উঠে আসে, বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর)-এর পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রাজধানীর অন্তত ১০ থেকে ১৫টি এলাকায় ২৫টিরও বেশি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ঠিক একই সময়ে শুধু ঢাকাতেই অন্তত পাঁচটি বাসে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়।

ধারাবাহিকভাবে আওয়ামী দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে ওঠে একের পর এক নাশকতা এবং অরাজকতার অভিযোগ। তার সঙ্গে আশুলিয়ার প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানা চত্বরে অগ্নিকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরই কমলাপুর রেলস্টেশনে ট্রেনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন এক প্রশ্নের আবহ।

এসব ঘটনাকে সামনে রেখে অনেকেই মনে করছে, রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সাভারের আশুলিয়ার প্রীতি গ্রুপের পোশাক কারখানা চত্বরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডটি নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরাই ঘটিয়েছে।

সেই সঙ্গে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে দেশের একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে আগুনের সঙ্গেও সংগঠনটির যোগসাজশ থাকতে পারে বলে মনে করছে অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা

অন্যদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সন্ত্রাসীদের এসব নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবসময় তৎপর রয়েছে বলে জানান বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার।

আগুনের পর আগুন—কখনো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়, কখনো শিল্পকারখানায়, আবার কখনো যানবাহনে। কিন্তু একের পর এক ঘটনার এই পরম্পরায় প্রশ্নের আগুনটিও যেন নিভছে না—এসব কি শুধুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে আরও বড় কোনো পরিকল্পনা? উত্তর মিলবে তদন্তে, আর সেই তদন্তের দিকেই এখন তাকিয়ে দেশ। তবে, তার আগে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে আরো সতর্ক হওয়ার আহ্বান সচেতন মহলের।