রবিবার

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

কারামুক্ত হয়ে সাংবাদিক ইলিয়াসকে ভিডিও কলে ধন্যবাদ জানালো খালাসপ্রাপ্তরা

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৫৬

শেয়ার

কারামুক্ত হয়ে সাংবাদিক ইলিয়াসকে ভিডিও কলে ধন্যবাদ জানালো খালাসপ্রাপ্তরা
ছবি বাংলা এডিশন

ফেনীর আলোচিত নুসরাতকাণ্ডে, কারামুক্ত একজনের সাথে ভার্চ্যুয়ালি, সৌজন্য কথা বলছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসাইন। এসময় দীর্ঘ সাত বছর পর, কারামুক্ত এক ভুক্তভোগী, সাংবাদিক ইলিয়াসের উদ্দেশ্যে আবেগাপ্লুত হয়ে এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ইলিয়াস হোসাইনের করা সংবাদে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ জন্য তারা আল্লাহর কাছে দোয়া করছেন এবং মনে করছেন, তাদের পাশে দাঁড়াতে আল্লাহ যেন সাংবাদিক ইলিয়াসকে একজন দূতের মতো পাঠিয়েছেন।

ভিডিও কলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ

ভিডিও কলে যুক্ত হয়ে তারা জানায়, কঠিনতম ওই সময়ে যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তখন সাংবাদিক ইলিয়াসই তাদের কাছে সৃষ্টিকর্তার পাঠানো সাহায্যকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।

মুক্তির আনন্দ প্রকাশের পাশাপাশি কারামুক্তরা জানায়, মিথ্যা মামলার বিভীষিকায় তাদের অনেকেরই স্মৃতিভ্রম হয়েছে এবং শরীরের ব্যথা-বেদনায় তারা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতেও পারছে না। পাশাপাশি তারা জানায়, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের ঋণ শোধ হবে না কোনোদিন।

শিশু রাখির স্বপ্ন ও মায়ের কৃতজ্ঞতা

কোনো অপরাধ না করেও শিশু মোবাশ্বেরা খানম রাখি ৭ বছর মায়ের সাথে জেলে থাকার পর মুক্তির পর সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়ে জানায়, তার জীবনের স্বপ্নের কথা।

মা ও মেয়ে জেলের অন্ধকার থেকে বের হয়ে, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের সাথে সরাসরি কথা বলতে পেরে, মা কামরুন্নাহার মনিও ব্যাকুল কণ্ঠে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

একইভাবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন কারামুক্ত আফসার মাষ্টার। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের সাথে ভিডিও কলে কথা বলে ধন্যবাদ জানান তিনি।

ইলিয়াস হোসাইনের স্ট্যাটাস

এই আবেগঘন ফোনালাপের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন। সেখানে তিনি জানান, ফেনী থেকে পাঠানো এই ভিডিওর মানুষগুলো মুক্ত হলেও, ওই মামলায় ১৬ জনের মধ্যে ১০ জন মুক্ত হলেও, একজন নারীসহ আরও ৬ জন এখনও কারাবন্দি রয়েছে।

শুনানির দীর্ঘসূত্রিতায় যেন তাদের মুক্তি বিলম্বিত না হয়, সে বিষয়ে সরকারের কাছে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেয়ার জোরালো আহ্বান জানান তিনি। একইসঙ্গে, তিনি লেখেন, মামলায় জর্জরিত প্রতিটি পরিবার আর্থিকভাবে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রের উচিত তাদেরকে অবিলম্বে যথাযথ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া।

মনি ও রাখির মর্মান্তিক অধ্যায়

এই দীর্ঘ কারাবাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায় কামরুন্নাহার মনি ও তার শিশু কন্যা মোবাশ্বেরা খানম রাখি। জন্মের পর মায়ের আঁচল আর আপনজনের স্নেহের বদলে যার জীবনের প্রথম সাতটি বছর কেটেছে কারাগারের অন্ধকার চার দেয়ালের ভেতর।

দীর্ঘ ৭ বছর পর জেল থেকে মুক্ত হয়ে আসার সময়ও ছোট্ট রাখির হাতে পরম যত্নে ধরা ছিল সেই কাপড়ের পুতুলটি। আর এই বন্দিদশার মাঝেই জেলের ভেতর মনির স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ায় ভেঙে যায় সংসার, পিতৃহীন হয় শিশু রাখি।

কারাগারের নিষ্ঠুর সেই আবহেই জন্ম হয়েছিল অবোধ শিশু মোবাশ্বেরার। কামরুন্নাহার মনি জানান, গর্ভবতী থাকায় তাকে সরাসরি আঘাত না করা হলেও মোটা বেত দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়েছিল। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চোখের সামনে ভাইদের ওপর ইলেকট্রিক শক দেয়া, হাত ঝুলিয়ে পিটানো কিংবা নখ উপড়ে ফেলার মতো হাড়হিম করা বর্বরতা দেখেছেন তিনি। রিমান্ডে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয়েছিল কাল্পনিক ও মিথ্যা জবানবন্দি।

খালাস ও ক্ষোভের কথা

অবশেষে সাড়ে সাত বছরের আইনি লড়াই ও হাইকোর্টের রায়ে মনিসহ ইমরান, রানা, মহিউদ্দিন শাকিল, মো. শামীম ও ইমরান হোসেন মামুনসহ ১০ জন নিরপরাধ মানুষ পুরোপুরি খালাস পেয়েছেন। ইফতেখার উদ্দিন রানা মুক্ত হয়ে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে মাথার ওপর থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে বাবার পরম ছায়া।

অন্যদিকে, পুরো ঘটনাকে সাজানো ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বনজ কুমারের ওপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন কারামুক্ত মহিউদ্দিন শাকিল।

জীবনের এই অমূল্য এবং অপূরণীয় ক্ষতি কে পূরণ করবে, দৃপ্ত কণ্ঠে সেই প্রশ্ন তোলে তারা। রিমান্ডের অমানুষিক ও অমানবিক নির্যাতনের ভয়াবহ শিকারে পরিণত হয়ে অনেকেই শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন, মেরুদণ্ডের তীব্র ব্যথাসহ শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা জটিল ব্যাধি।

কারাগার থেকে বেরিয়েই গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়ে কারামুক্ত মো. শামীম অভিযোগ করেন, অর্থের কাছে বিকিয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক অপপ্রভাবের বলি বানিয়ে বিনা অপরাধে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তাদের পুরো জীবন।

কারাজীবনের অন্ধকূপে থাকা অবস্থায় শেষ সময়ে নিজের বাবার পাশেও থাকতে পারেননি ইমরান হোসেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া পারিবারিক অর্থনীতি আর জীবনের এই অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার কে নেবে আকুল কণ্ঠে সেই বিচার চান তিনি।

ন্যায়বিচারের জয় ও ইলিয়াসের ভূমিকা

আর সত্য ঘটনা উন্মোচনের মাধ্যমে ১০ জনের এই খালাস পাওয়াকে ন্যায়বিচারের জয় হিসেবে দেখছেন তারা। কামরুন্নাহার মনিসহ কারামুক্ত সকলেই অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের ভূমিকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এর আগেও।

কিন্তু, বারবার কেন এই অসীম কৃতজ্ঞতা জানায় কারামুক্তরা? কারণ, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র আর নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম তাদের খুনি সাজিয়ে ফাঁসির দড়ির দিকে ঠেলে দিয়েছিল, তখন এই ইলিয়াস হোসাইন তার আলোচিত ‘ফিফটিন মিনিটস’ প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথম প্রমাণ করেছিলেন, এটি কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি নিখুঁত আত্মহত্যার ছক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য উন্মোচনের সেই সাহসী পদক্ষেপই, কারামুক্তদের কাছে ইলিয়াস হোসাইনকে সৃষ্টিকর্তার পাঠানো সাহায্যকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তার আলোচিত ‘ফিফটিন মিনিটস’ প্রতিবেদনে উঠে আসে, প্রেমিক মিন্টুর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও একাধিক প্রেমের গল্প এবং পুলিশ কর্মকর্তা শরীফকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে চরম হতাশায় ছিলেন নুসরাত। ছেলেদের সাথে মেলামেশার জেরে অধ্যক্ষ বহিষ্কার করলে, তিন বান্ধবী মিলে সে সাজায় ইভটিজিংয়ের নাটক। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে আগুন লাগানোর ৩ দিন আগেও সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।

ওই প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, সত্য ধামাচাপা দিতে, তখনকার পিবিআই কর্মকর্তারা গায়েব করে ফেলে আশপাশের প্রায় ১০০টি সিসিটিভি ফুটেজ এবং তিনদিন গোপন রাখা হয় নিহতের মূল ‘ডায়িং ডেক্লারেশন’। রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি এবং মাকসুদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় পিবিআই।

অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত শামীমের মোবাইল লোকেশন প্রমাণ করে, সে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৫ মাইল দূরে ছিল। ফাঁস হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা অজিতের পুকুর থেকে বোরকা উদ্ধারের সাজানো নাটক, যিনি পরবর্তীতে নিজেই গাড়ি চাপা পড়ে মারা যান। মাদ্রাসার দপ্তরি নুরুল আমিনকে ভয় দেখিয়ে বানানো হয় ৪ নম্বর সাক্ষী, আর আত্মহত্যার আগাম এসএমএস নিয়ে পিবিআইয়ের কাছে যাওয়া নুসরাতের প্রাইভেট শিক্ষক আফসার উদ্দিনকে বানানো হয় ৮ নম্বর আসামি।