কানাডার টরন্টো ও আশপাশের এলাকায় নাভানা গ্রুপের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম সুমনের নামে ১৩টি বিলাসবহুল বাড়ি ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১২টি সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৩১ কোটি টাকা। কানাডার সরকারি ভূমি রেকর্ড এবং সাম্প্রতিক বাজারদর বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে কানাডার আরও কয়েকটি শহরে সুমন ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পদ থাকার তথ্য মিলেছে। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর এবং এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডায় নাভানা পরিবারের সম্পদ ও আর্থিক স্বার্থের তথ্যও পাওয়া গেছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, নাভানা পরিবারের সদস্যরা দেশে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপির পরিস্থিতির মধ্যেই বিদেশে উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। বর্তমানে নাভানা গ্রুপের কাছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
নাভানা গ্রুপের শেকড় ১৯৬৪ সালে জহুরুল ইসলাম প্রতিষ্ঠিত ইসলাম গ্রুপে। জহুরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তার ভাই শফিউল ইসলাম কামাল ইসলাম গ্রুপ থেকে বের হয়ে নাভানা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে কামাল প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান। তার বড় ছেলে সাইফুল ইসলাম সুমন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, মেজো ছেলে সাজেদুল ইসলাম শুভ্র ভাইস চেয়ারম্যান এবং স্ত্রী খালেদা ইসলাম, ছোট ছেলে শাহেদুল ইসলাম ও মেয়ে ফারহানা ইসলাম পরিচালক পদে রয়েছেন।
২০১৮ সালে কামাল অসুস্থ হওয়ার পর থেকে সুমন ও শুভ্র নাভানা গ্রুপের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সুমন ও তার ছোট ভাই শাহেদুল দীর্ঘদিন ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন।
টরন্টো ও আশপাশে ১৩ সম্পত্তি
সরকারি ভূমি রেকর্ড অনুযায়ী, সুমনের নামে শনাক্ত সম্পত্তিগুলো টরন্টোর স্কারবরো, নর্থ ইয়র্ক ও কেন্দ্রীয় টরন্টোর পাশাপাশি গ্রেটার টরন্টো এরিয়ার মিসিসাগা ও ব্র্যাম্পটনে অবস্থিত। এসব সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে আবাসিক বাড়ি, টাউনহাউস, কনডোমিনিয়াম এবং আবাসিক-বাণিজ্যিক ইউনিট।
সম্পত্তিগুলোর বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বশেষ ক্রয়-বিক্রয়ের নথি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় একই ধরনের সম্পত্তির সাম্প্রতিক বাজারদর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।
সুমনের নামে শনাক্ত সবচেয়ে মূল্যবান সম্পত্তিটি স্কারবরোর ১২৫ ইউক্লিড অ্যাভিনিউয়ে। ছয় হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের কাস্টম-বিল্ট বাড়িটির আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য ২৯ লাখ কানাডিয়ান ডলার, যা প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
মিসিসাগার লর্ন পার্ক এলাকায় ১২৭০ বার্চভিউ ড্রাইভের বাড়িটির বাজারমূল্য প্রায় ১৮ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২৩ কোটি টাকা। টরন্টোর কাসা লোমা এলাকার ৩৯০ ওয়ালমার রোডের বাড়িটির মূল্য প্রায় ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ডাউনটাউন টরন্টোর ৮২৫ চার্চ স্ট্রিটের মিলান কন্ডোসে সুমনের নামে একটি আবাসিক ইউনিট রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ৭ কোটি ১২ লাখ টাকা।
টরন্টোর ১৪২ ক্লিনসাইড রোডের তিনতলা টাউনহাউসটির মূল্য প্রায় ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা। স্কারবরোর ৩৩০ ম্যাককাওয়ান রোডের কনডোমিনিয়াম অ্যাপার্টমেন্টটির মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
টরন্টোর ৭ ভিভিয়ান রোডের কনডোমিনিয়াম টাউনহাউসটির মূল্য প্রায় ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। নর্থ ইয়র্কের ১৪৪৫ উইলসন অ্যাভিনিউয়ের কনডোমিনিয়াম অ্যাপার্টমেন্টটির মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
স্কারবরোর ৩৭ ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউয়ের ডিটাচড বাড়িটির মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। একই এলাকার ২১ রকউড ড্রাইভের কনডোমিনিয়াম টাউনহাউসটির মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
নর্থ ইয়র্কের ১৩৪৪ লরেন্স অ্যাভিনিউ ওয়েস্টের ফ্রিহোল্ড সেমি-ডিটাচড বাড়িটির মূল্য প্রায় ৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ব্র্যাম্পটনের ১০৬ বার ক্রিসেন্টের ডিটাচড ফ্রিহোল্ড বাড়িটির মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
১৩টি শনাক্ত সম্পত্তির মধ্যে একটি টরন্টো স্ট্যান্ডার্ড কনডোমিনিয়াম ইউনিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়নি। বাকি ১২টি সম্পত্তির মোট আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৩১ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
বিদেশি সম্পদের তথ্য চেয়েছে বিএফআইইউ
বাংলাদেশের আর্থিক গোয়েন্দাদের ধারণা, কানাডায় সুমনের স্ত্রী তাজিনা এইচ ইসলাম ও ছোট ভাই শাহেদুল ইসলামের নামেও সম্পদ থাকতে পারে। দুবাইয়ের আল সাতওয়া এলাকার জুমেরাহ গার্ডেন সিটিসহ একাধিক অভিজাত এলাকায় নাভানা পরিবারের সম্পদ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।
বিদেশে পরিবারের সম্পদের পূর্ণ বিবরণ জানতে বিভিন্ন দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তথ্য চাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। নাভানা পরিবারের বিদেশি আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানের পর সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
নথিপত্রে ২০০৭ সালের আগেই সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে নাভানা পরিবারের সদস্যদের বিপুল অর্থ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সিঙ্গাপুরের অ্যাকাউন্ট থেকে আন্তর্জাতিক হেজ ফান্ডেও বিনিয়োগের তথ্য রয়েছে। সাইফুল ইসলাম ও সাজেদুল ইসলাম বিনিয়োগের মাধ্যমে এন্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার নাগরিকত্ব নিয়েছেন বলেও অনুসন্ধানে তথ্য উঠে এসেছে।
এ ছাড়া একাধিক আন্তর্জাতিক লেনদেন অনুমোদন ছাড়া করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশে এ ধরনের আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
২০২০ সালে সুমনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান
অর্থ পাচার ও কানাডায় ব্যবসা সম্প্রসারণের অভিযোগে ২০২০ সালে সাইফুল ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন। কয়েক মাস পর সেই অনুসন্ধান বন্ধ হয়ে যায়। অনুসন্ধানটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বন্ধ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
একই সময়ে খেলাপি ঋণে থাকা নাভানা গ্রুপকে নতুন করে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। পরে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে মোট ৫০০ কোটি টাকা নতুন ঋণ দেওয়া হয়।
কানাডায় থাকা সম্পত্তির বিষয়ে সাইফুল ইসলাম সুমনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদকের ফোন নম্বর তিনি ব্লক করে রাখায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:







