সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। পরিবেশ রক্ষার কথা বলেই যার ক্ষমতার কেন্দ্রে উত্থান—কিন্তু সেই ক্ষমতাকে পুঁজি করেই কি পরিবেশের বিপর্যয় আর অনিয়মের বিস্তার? একের পর এক তদবির-বাণিজ্য, দুর্নীতি, অনিয়ম আর সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ঘিরে এখন প্রশ্নের মুখে সাবেক এই উপদেষ্টার ভূমিকা।
২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
পরিবেশ রক্ষার ফাঁকা বুলি ও বিপর্যয়ের অভিযোগ
সমালোচনাকারীদের মতে, পরিবেশ রক্ষার ফাঁকা বুলি ছেড়ে ক্ষমতায় আসা এই উপদেষ্টার সময়েই পরিবেশের সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটেছে। অভিযোগ রয়েছে, সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর লুটের ঘটনায় উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসানের গোপন আঁতাত ছিল।
২০২৫ সালের মে মাসে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিত চিঠি দিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে পাথর উত্তোলন বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও, সেই চিঠির কোনো জবাব দেয়া হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। সাদা পাথরের লুণ্ঠনের সময় রিজওয়ানার এই নীরবতাকে ঘিরেই প্রশ্ন উঠেছে নানা সময়ে।
নিষিদ্ধ পলিথিন ও সিন্ডিকেটের অভিযোগ
এছাড়াও সাবেক এই উপদেষ্টা নিষিদ্ধ পলিথিনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছিলেন। এমনকি পলিথিনের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযানও শুরু করা হয়েছিল সে সময়। কিন্তু অল্প কিছুদিনের ব্যবধানেই হঠাৎ থেমে গেল সেই অভিযান। কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, পলিথিন উৎপাদকরা রিজওয়ানার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর মাধ্যমে এই অভিযান রুখে দিয়েছেন। এমনকি এর বিনিময়ে পলিথিন উৎপাদকদের কাছ থেকে বিশাল একটি অঙ্ক হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পলিথিন নিষিদ্ধ করে, উলটো সুযোগ তৈরি করে, অবৈধ সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নিয়েছেন রিজওয়ানা। খোদ পলিথিন কারখানা মালিকরাই তুলেছে এমন প্রশ্ন।
ঢাকার পলিথিন কারখানার একাধিক মালিক সেসময়ে রিজওয়ানার ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও সেন্টমার্টিন নিয়ে অভিযোগ
অন্যদিকে, ক্ষমতায় আসার পর জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে জোরপূর্বক গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে সরিয়ে তা দখলের অভিযোগও উঠেছে সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে।
একইভাবে, সেন্টমার্টিন নিয়ে রিজওয়ানা হাসানের কর্যক্রম তৈরি করে ব্যাপক বিতর্ক। পরিবেশ রক্ষার নামে দ্বীপটিতে পর্যটন নিয়ন্ত্রণে একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করে দীর্ঘ সময় পর্যটকদের যাতায়াতও বন্ধ রাখার আড়ালে সেন্টমার্টিনকে কার্যত অকেজো করে রাখার অভিযোগ পাওয়া যায় তার বিরুদ্ধে।
সম্পদের হিসাব ও দুদকে অভিযোগ
এছাড়াও রিজওয়ানার সম্পদের হিসাব নিয়েও সামনে আসে নানা প্রশ্ন। বিভিন্ন, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—উপদেষ্টা হওয়ার আগে রিজওয়ানা হাসান তাদের কোনো সম্পত্তি নেই বলে জানিয়েছিলেন; কিন্তু উপদেষ্টা হওয়ার পর হঠাৎ করেই রিজওয়ানা ও তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর সম্পদ বাড়ার বিষয়টি নিয়ে উঠেছে প্রশ্নের তীর।
সাবেক এই পরিবেশকর্মীর দুর্নীতির অভিযোগের তালিকা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ দুদকে জমা পড়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ, অন্যের সম্পত্তি জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেয়া ও অবৈধ দখল এবং পরিবেশ দূষণের অভিযোগ দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ।
স্বামী আবু বকর সিদ্দিকীর ভূমিকা
অভিযোগ অনুযায়ী, এসবের বড় একটি অংশের কেন্দ্রে ছিলেন রিজওয়ানার ‘ক্রাইম পার্টনার’ তার স্বামী আবু বকর সিদ্দিক। একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে—রিজওয়ানা উপদেষ্টা হওয়ার পর পরিবেশ খাতসহ বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিলেন এবি সিদ্দিকী। পরিবেশ ছাড়পত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদায়ন ও সরকারি কাজ—সব ক্ষেত্রেই তার নাম পাওয়া যায় বলে এসব প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
আর এসব অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক বিভিন্ন সময়ে অভিযানে নামলেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলয়ে বারবার থামিয়ে দেয়া হয় তাদের অভিযান—এমন তথ্যও উঠে এসেছে বিভিন্ন সূত্রে।
পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসা একজন নীতিনির্ধারকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের তদন্ত করে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার আহবান সবার।
আরও পড়ুন:







