শনিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪ আশ্বিন, ১৪৩৩

ভারতকে যা দিয়েছি, আজীবন মনে রাখবে; কেন বলেছিলেন হাসিনা?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৬:০৮

শেয়ার

ভারতকে যা দিয়েছি, আজীবন মনে রাখবে; কেন বলেছিলেন হাসিনা?
ছবি সংগৃহীত

সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল প্রতিবেশীর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা আতঙ্ক দূর করার মধ্য দিয়ে। ২০০৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই স্বৈরচার শেখ হাসিনা সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে দমনে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয়।

উলফা নেতাদের গ্রেপ্তার ও হস্তান্তর

আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়া, উপ-সামরিক প্রধান রাজু বড়ুয়া, অর্থ সম্পাদক চিত্রবন হাজারী এবং পরবর্তীতে অনুপ চেটিয়াসহ শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়। একইসাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটে তাদের একাধিক গোপন আস্তানা গুড়িয়ে দেয় বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এর মাধ্যমে দিল্লি পেয়ে যায় তাদের স্বপ্নের জিরো-রিস্ক সেফ জোন। কিন্তু বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে গত ১৫ বছরে কেবল একতরফা প্রাপ্তির এক দীর্ঘ খতিয়ানই চোখে পড়ে, যেখানে নেয়ার পাল্লায় সবই ছিল ভারতের, আর দেয়ার বেলায় বাংলাদেশের ঝুলি ছিল শূন্য।

ট্রানজিট ও বন্দর সুবিধা

ভারতের দীর্ঘদিনের ভূ-রাজনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক আকাঙ্ক্ষা ছিল বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে নিজেদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সেভেন সিস্টার্স রাজ্যে যোগাযোগের করিডোর তৈরি করা। শেখ হাসিনা সরকার নামমাত্র মাশুলে, ক্ষেত্রবিশেষে প্রায় বিনামূল্যে ভারতকে সেই ট্রানজিট সুবিধা দেয়।

আশুগঞ্জ নৌবন্দর থেকে শুরু করে আখাউড়া-আগরতলা রেলপথ, এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের বুক চিরে ভারতের এক অংশ থেকে আরেক অংশে ট্রেন চলাচলের উন্মুক্ত ট্রানজিট নিশ্চিত করা হয়।

কেবল সড়ক, নৌ ও রেলপথই নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ডখ্যাত চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের পূর্ণ অধিকার দেয়া হয় ভারতকে। আর ২০১৯ সালের অক্টোবরে বঙ্গোপসাগরে ভারতের কোস্টাল সার্ভিল্যান্স রাডার সিস্টেম বসানোর সমঝোতা স্মারক সই হয়।

এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের নিজস্ব জলসীমায় ভারতের সার্বক্ষণিক সামরিক ও কৌশলগত নজরদারির সুযোগ তৈরি হয়, যা বাংলাদেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করে সামরিক বিশেষজ্ঞরা।

পানি বণ্টন ও অর্থনৈতিক শোষণ

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত শোষণের চিত্রটি ছিল আরও ভয়াবহ। বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি ২০১১ সালে চূড়ান্ত হয়েও গত ১৫ বছরে এক ইঞ্চিও এগোয়নি। গঙ্গার পানিবণ্টনের ন্যায্য হিস্যা থেকেও বঞ্চিত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু উল্টো, ২০১৯ সালে মানবিক কারণ দেখিয়ে ত্রিপুরার সাবরুম শহরের সুপেয় পানির জন্য ফেনী নদী থেকে ১ দশমিক আট দুই কিউসেক পানি প্রত্যাহারের সুযোগ দেয়া হয় ভারতকে।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পরিণত করা হয় ভারতীয় পণ্যের এক বিশাল একচেটিয়া বাজারে। প্রতি বছর ভারতের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছিল ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারে। অথচ বাংলাদেশি গার্মেন্টস ও পাটপণ্যের ওপর ভারত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা বজায় রাখে। উপরন্তু, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পরিবেশগত সংকট উপেক্ষা করে নির্মিত হয় রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র।

আর শোষণের চূড়ান্ত উদাহরণ ছিল ভারতের আদানি গ্রুপের সাথে করা ২০১৭ সালের ১৫৪৯ মেগাওয়াটের বিতর্কিত বিদ্যুৎ চুক্তি। ওই চুক্তি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ না নিলেও বছরে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলার বা ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে বাধ্য থাকে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিপিডির বিশ্লেষণে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য এক তরফা শোষণের দলিল হিসেবে অভিহিত করা হয়।

রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের অভিযোগ

বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে নগ্ন দিকটি ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও প্রশাসনে দিল্লির সরাসরি হস্তক্ষেপ। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কীভাবে দিল্লির রাজনৈতিক ইশারায় চলত, তার প্রথম প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এসে তখনকার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে নির্বাচনে অংশ নিতে সরাসরি চাপ প্রয়োগ করেন। এরশাদ নিজেই পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছিলেন যে, ভারতে, জামায়াত-শিবির বা মৌলবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসার ভয় দেখিয়ে তাকে নির্বাচনে রাখা হয়েছিল।

পরবর্তীতে ২০১৮ সালের রাতের ভোট এবং ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচন প্রতিটি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবি তুললেও, ভারত প্রকাশ্যে শেখ হাসিনা সরকারকে নিরঙ্কুশ সমর্থন দেয়।

এমনকি মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম ও র‍্যাবের ওপর মার্কিন স্যাংশন কিংবা নতুন ভিসা নীতি এড়াতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল ও কূটনৈতিক মহল ওয়াশিংটনের কাছে জোরালো লবিং করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করে।

হাসিনার নিজের স্বীকারোক্তি

এই একতরফা ও অনুগত কূটনীতির সত্যতা উঠে আসে ২০১৮ সালে। ওই বছরের মে মাসে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে খোদ শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ভারতকে যা দিয়েছেন, তা তারা আজীবন মনে রাখবে।

২০১৯ সালের আগস্টে তৎকালীন হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ছাড়িয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বামী-স্ত্রীর মতো।

এমনকি ২০২২ সালের ১৮ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে এ কে আব্দুল মোমেন খোলাখুলি স্বীকার করেন, ভারতে গিয়ে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, তা যেন তারা করে।

সীমান্ত হত্যা ও পতন

নেতাদের কাছে এই সম্পর্ক রক্তের রাখিবন্ধন হলেও সাধারণ বাংলাদেশির জন্য সীমান্ত ছিল এক অভিশপ্ত মৃত্যুর নাম। গত ১৫ বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের গুলিতে ফেলানী খাতুনসহ প্রায় ৬ শতাধিক নিরীহ বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

কিন্তু এই নির্মম সীমান্ত হত্যার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকার কখনোই কোনো জোরালো প্রতিবাদ বা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার দাবি করেনি।

কিন্তু ভূ-রাজনীতি ও ইতিহাসের পরম সত্য হলো, কোনো বিদেশি শক্তির একক সহায়তায় কোনো স্বৈরাচারই নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে গিয়ে চিরকাল টিকে থাকতে পারে না। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাসের ঘরের মতো ধসে পড়ে ১৫ বছরের সাজানো আধিপত্যের ভিত্তি। ৫ আগস্ট, যে ভারতের ইশারায় তিনি দেশ পরিচালনা করতেন বলে অভিযোগ, সেই ভারতেই তাঁকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত একটি দেশের ১৮ কোটি জনগণকে পাশ কাটিয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট দল ও ব্যক্তির ওপর বাজি ধরার যে চরম কূটনৈতিক ভুল নীতি গ্রহণ করেছিল, ৫ আগস্টের পর তার ঐতিহাসিক পতন ঘটেছে। বাংলাদেশ এখন নতুন এক সার্বভৌম যুগে দাঁড়িয়ে, যেখানে যেকোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে আগামীর সম্পর্কের ভিত্তি নির্ধারিত হবে, কোনো প্রভুর ইশারায় নয়। আর এই সম্পর্ক হবে, সমতা, মর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের অনড় নীতিতে।