শনিবার

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

বাংলাদেশের পাশে পাকিস্তান সম্পর্ক খারাপে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৩৩

শেয়ার

বাংলাদেশের পাশে পাকিস্তান সম্পর্ক খারাপে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পর্যায়ের স্কলারশিপ নিয়ে সম্প্রতি কিছু নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে বিভ্রান্তি এবং অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।

নলেজ করিডোর প্রকল্পের ঘোষণা

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে ঘোষিত এই নলেজ করিডোর প্রকল্পে ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তির কথা বলা হয়েছিল, যার মধ্যে টিউশন ফি, মাসিক মেইনটেন্যান্স ভাতা, আবাসন খরচ, এককালীন সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স ও রিটার্ন এয়ার টিকিট অন্তর্ভুক্ত ছিল।

কিন্তু প্রথম ব্যাচের ৭৪ জন শিক্ষার্থী যাওয়ার পর সম্প্রতি দ্বিতীয় ধাপের মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অফার লেটার পাওয়ার পর অভিযোগ ওঠে যে, তাদের কেবল টিউশন ফি ও আবাসন সুবিধা দেয়া হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে জীবনযাত্রার ভাতা, খাবারের খরচ, যাতায়াত, বিমান ভাড়া, ভিসা ফি এবং স্বাস্থ্যবীমার খরচ বাদ দেয়া হয়েছে; এমনকি পছন্দকৃত বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামের বদলে আলোচনার বাইরে অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে।

অফার লেটার ও টিকিটে ভিন্ন চিত্র

তবে শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত অফার লেটার ও ভ্রমণের নথিপত্র বিশ্লেষণ করলে এসব অভিযোগের ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের প্রাপ্ত আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল স্কলারশিপের অফার লেটারে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, শতভাগ টিউশন ফি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করবে পাকিস্তানের হায়ার এডুকেশন কমিশন।

পাশাপাশি জীবনযাত্রার জন্য মাসিক ২৫ হাজার পাকিস্তানি রুপি মেইনটেন্যান্স ভাতা, প্রতি বছর ১০ শতাংশ ইনক্রিমেন্টসহ, ১৫ হাজার রুপি হোস্টেল ভাতা, এককালীন ৪৫ হাজার রুপি সেটেলমেন্ট ভাতা এবং ইকোনমি ক্লাসের রাউন্ড-ট্রিপ বিমান টিকিট প্রদানের বিষয়টিও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।

বিমান ভাড়া বা টিকিট দেয়া হচ্ছে না বলে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে, তাও ভুল প্রমাণ করে শিক্ষার্থীদের কাছে আসা বিমান টিকিট। ইতোমধ্যেই বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ২০২৬ তারিখে ঢাকা থেকে শারজাহ হয়ে ইসলামাবাদ গমনের এয়ার অ্যারাবিয়ার টিকিটও শিক্ষার্থীদের প্রদান করা হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব শিক্ষার্থীর অভিযোগকে পুঁজি করেই কয়েকটি গণমাধ্যমে শুরু হয় নানামুখী অপপ্রচার ও ভুল তথ্যের উপস্থাপন। আন্তর্জাতিক মানের এমন একটি শিক্ষাবৃত্তিকে ঘিরে বেনামি এসব অভিযোগের উদ্দেশ্য নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

প্রকল্পের সূচনা ও এক্সপো

বিতর্কের আড়ালে থাকা নলেজ করিডোরের মূল গল্পটির শুরু ২০২৫ সালের আগস্টে। দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরে দুই দেশের শিক্ষা ও গবেষণা বাড়াতে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেয়া হয়। যার আওতায় পাঁচ বছরে ব্যাচেলরস, মাস্টার্স এবং পিএইচডি পর্যায়ে মোট ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তির প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়।

ইতিমধ্যেই এই বৃত্তির প্রথম ধাপে ৭৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই গত মে মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরে অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তান হায়ার এডুকেশন এক্সপো ২০২৬।

এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন। এসময় তিনি পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করে মন্তব্য করেন, তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক দূর এগিয়ে গেছে।

আর মেলাজুড়েই দেখা যায় উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস।

শিক্ষার্থীদের ভিন্ন অভিমত

এদিকে সংবাদমাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের বিপরীতে পাকিস্তানের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যাচের বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা।

পাকিস্তানের ফাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় ব্যাচের বাংলাদেশি ছাত্র মোহাম্মদ নাইমুর রহমান জানান, সেখানকার শিক্ষাজীবন অত্যন্ত চমৎকার এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দেয়ার পরামর্শ দিয়ে নাইমুর রহমান জানান, যাচাই-বাছাই ছাড়া গুজব ছড়ানো থেকে সবার বিরত থাকা উচিত।

একই অভিমত ডাও ইউনিভার্সিটি অফ হেলথ সায়েন্সেসের ডক্টর অফ ফার্মেসির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইসলাম সাদিকের। তিনি নিশ্চিত করেন, বৃত্তি ও ভাতা প্রাপ্তি নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা নেই।

তার তথ্যমতে, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পুরো এক বছরের হাতখরচের স্টাইপেন্ড হিসেবে প্রায় ৩ লাখ ৩০ হাজার পাকিস্তানি রুপি এককালীন পরিশোধ করা হয়েছে। একইসঙ্গে টিউশন ফি ও আবাসন বাবদ আনুমানিক ৫ থেকে ৬ লাখ রুপি সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছে দেশটির হায়ার এডুকেশন কমিশন।

ডাও রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ বায়োটেকনোলজির শিক্ষার্থী তাহসিন আহমেদ শক্তি চলমান বিতর্ককে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

তিনি জানান, দ্বিতীয় ধাপে ব্যাচেলরে ১১২, মাস্টার্সে ১১ এবং পিএইচডিতে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে পূর্ণাঙ্গ বৃত্তির সুযোগ দেয়া হয়েছে।

তাহসিন আরো স্পষ্ট করেন, ওয়েটিং লিস্টে থাকা কয়েকজনকে শর্তসাপেক্ষে আংশিক ছাড় দেয়া হয়েছিল, যা নিয়ে গণমাধ্যম বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। অফিসিয়াল তথ্যের বাইরে কোনো অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

একই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী মুয়াজ মেহেদী রোহান জানান, পৌঁছানোর এক মাসের মধ্যেই ৪৫ হাজার রুপি সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্সসহ পুরো বছরের স্টাইপেন্ড ব্যাংকে জমা হওয়ায় কোনো আর্থিক কষ্ট পোহাতে হচ্ছে না।

সফলভাবে প্রথম সেমিস্টার শেষ করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যারা এখনও ক্যাম্পাসে পৌঁছায়নি তাদের কথা ধরে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে।

হাইকমিশনের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি

চলমান এই বিতর্কের মাঝেই নিজেদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করেছে বাংলাদেশে নিযুক্ত পাকিস্তান হাইকমিশন। তারা জানিয়েছে, স্নাতকের তুলনায় মাস্টার্স পর্যায়ের আর্থিক সহায়তার প্রক্রিয়ায় কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও, যোগ্য সবাইকে সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তাই দেয়া হবে। দ্বিতীয় ব্যাচে ৩ হাজারের বেশি আবেদনকারীর মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই শেষে ১২৫ জন স্নাতক, ২২ জন মাস্টার্স এবং ১৪ জন পিএইচডি প্রোগ্রামের জন্য চূড়ান্ত হয়েছেন।

দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

শিক্ষার এই সংযোগ মূলত দীর্ঘ ১৭ বছরের কূটনৈতিক স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা এক নতুন সমীকরণেরই অংশ। এছাড়া, বাণিজ্যে গতি ফেরাতে রেনকন গ্রুপের মাধ্যমে এ বছরই দেশে আসছে পাকিস্তানের এমজিজেডব্লিউ-এর ১০০টি গাড়ি, যা আগামী চার বছরে উন্নীত হবে ৫ হাজার ৮০০টিতে।

আর ভোগান্তি কমিয়ে দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০২৬ সালের বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) থেকে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট সচল করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এর আগে ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি নোঙর করে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ ইউয়ান জিয়াংফাং।

কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানের নেতৃত্বে ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল পাকিস্তান সফর করে। এছাড়া, সাম্প্রতিক বন্যায় প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের গভীর শোক প্রকাশ এবং সরকারি স্কুলগুলোর জন্য এক হাজার ফুটবল উপহার, প্রমাণ করে সমমর্যাদার ভিত্তিতে বহুমুখী সম্পর্কে এগোচ্ছে দুই দেশ।

নামসর্বস্ব কিছু অভিযোগ ও গণমাধ্যমের অপপ্রচার শিক্ষাবৃত্তিকে ঘিরে সাময়িক ধোঁয়াশা তৈরি করলেও, তা ধোপে টিকছে না বলে মনে করে সচেতন মহল। বরং সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা, বাণিজ্য ও সামরিক কূটনীতিতে দুই দেশের এই মেলবন্ধন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সমমর্যাদা এবং গিভ অ্যান্ড টেক নীতির ভিত্তিতেই আগামী দিনে নির্ধারিত হবে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক।