শুক্রবার

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

মালয়েশিয়া যেতে শ্রমিকের ঘাড়ে সেই ৮ লাখের বোঝা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৪:০৭

শেয়ার

মালয়েশিয়া যেতে শ্রমিকের ঘাড়ে সেই ৮ লাখের বোঝা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য আবারও শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া চলছে। তবে শ্রমিকদের জন্য স্বস্তির খবর নেই। জনশক্তি রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এবার একজন শ্রমিককে মালয়েশিয়া যেতে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হতে পারে। অথচ আন্তর্জাতিক শ্রমনীতি অনুযায়ী, অভিবাসনের নিয়োগসংক্রান্ত ব্যয় নিয়োগকর্তার বহন করার কথা।

২০২৪ সালে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ ব্যয় ও ঋণ নিয়ে গবেষণা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শ্রম অধিকার গবেষণা সংস্থা ভেরিটে। গবেষণায় বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় চাকরি পেতে একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের গড়ে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা খরচ হয়। এর মধ্যে সরকারি ফি ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা, সিন্ডিকেট ফি ১ লাখ ৭ হাজার টাকা, মধ্যস্বত্বভোগীদের ১ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা, অতিরিক্ত ভিসা ফি ১ লাখ টাকা এবং বিমান ভাড়া ও প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য খরচ ৯৮ হাজার টাকা।

সরকারি হিসাবে বিএমইটির রেজিস্ট্রেশন বাবদ ১ হাজার ৫০০ টাকা, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ডে ২ হাজার ৫০০ টাকা, পাসপোর্ট ফি ৫ হাজার টাকা, মেডিকেল টেস্ট ৫ হাজার টাকা, এজেন্সি সার্ভিস চার্জ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণসহ অন্যান্য খরচ ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা নির্ধারিত ছিল। তবে বাস্তবে সরকারি ফি হিসেবে নির্ধারিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার তুলনায় ৭ থেকে ৮ গুণ বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে ভেরিটের গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই ব্যয় মেটাতে ৯৬ শতাংশ বাংলাদেশি শ্রমিক ঋণের ফাঁদে পড়েছেন। দুই বা ততোধিক জায়গা থেকে ঋণ নিতে হয়েছে ৮২ শতাংশ শ্রমিককে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলেছে, কোনো নিয়োগ ফি বা এ-সংক্রান্ত ব্যয় শ্রমিক বা চাকরিপ্রার্থীর ওপর চাপানো বা তাদের দিয়ে বহন করানো যাবে না। এসব ব্যয় নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির বহন করার কথা। কিন্তু মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলতে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় জনপ্রতি ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মালয়েশিয়াগামী কর্মী, রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

বাড়তি ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন সম্ভাব্য শ্রমিকরা

মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, রংপুর ও লালমনিরহাটের কয়েকজন যুবকের সঙ্গে কথা বলে বাড়তি অভিবাসন ব্যয় নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা জানা গেছে।

লালমনিরহাটের রনক ইসলাম জানান, তার পরিবারে অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুললে যাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে ভেবেছিলেন। এজন্য ঢাকার নয়াপল্টনে কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে কথাও বলেছেন। তবে খরচের কথা শুনে হতাশ হয়েছেন তিনি। তার পক্ষে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান রনক।

সৌদি আরবের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেমিট্যান্স পাঠানো দেশ মালয়েশিয়া। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করছেন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে প্রথম সরকারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর চারবার বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত করেছে মালয়েশিয়া। ১৯৯৭ ও ২০০৯ সালে আর্থিক ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এবং ২০১৮ ও ২০২৪ সালে সিন্ডিকেট, দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ফির অভিযোগে শ্রমবাজার স্থগিত হয়।

২৫ এজেন্সির তালিকা ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ২১ আগস্ট বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করে মালয়েশিয়ার বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস)।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রস্তুত করা ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা থেকে মালয়েশিয়া ২৫টি নির্বাচন করেছে। আরও ৩১২টি এজেন্সিকে সহযোগী এজেন্সি হিসেবে রাখা হয়েছে। এসব এজেন্সি মূল ২৫ এজেন্সির অধীনে কাজ করবে।

তালিকা প্রকাশের পর রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) নেতারা অভিযোগ করেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত সিন্ডিকেট। তাদের দাবি, ২৫টি এজেন্সির আড়ালে সরকারের কেন্দ্রে থাকা কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন।

বায়রার নেতারা আরও দাবি করেন, আগেরবারের মতো এবার সামনে মন্ত্রী, এমপি বা বড় কোনো প্রভাবশালীর রিক্রুটিং এজেন্সি নেই। বরং তালিকায় এমন কিছু নামসর্বস্ব এজেন্সি রয়েছে, যাদের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর তেমন অভিজ্ঞতা নেই।

২৫টি এজেন্সির মধ্যে গুডনেস সার্ভিসেস, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি, রিফা ইন্টারন্যাশনাল ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে মানবপাচার ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে মামলা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৫টির মধ্যে ১৭টি এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল গত তিন বছরে বিদেশে ১১১ জন কর্মী পাঠিয়েছে। ভালুকা ওভারসিজ ও বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ পাঠিয়েছে যথাক্রমে ২৩৫ ও ২৭০ জন।

সাতক্ষীরা এক্সপ্রেসের মালিক শেখ নজরুল দাবি করেছেন, গতবারও তিনি মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়েছেন, তবে অন্য এজেন্সির মাধ্যমে। এবার সরকারের নিয়ম মেনে আবেদন করেছেন এবং কোনো লবিং বা তদবির করেননি বলে দাবি তার।

আগেরবার সিন্ডিকেটের সদস্য ছিল প্রয়াত আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ। এবার তালিকায় থাকা ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেসের মালিকানায় রয়েছেন আবদুল হাইয়ের স্ত্রী লায়লা আরজুমান বানু। এজেন্সিটির ওয়েবসাইটে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে ফোন ধরেন তার ভাই নজরুল ইসলাম স্বপন। তিনি দাবি করেন, তাদের ব্যবসা আলাদা এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যোগ্যতার কারণেই তারা তালিকায় এসেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এজেন্সি যাচাই-বাছাই করেছে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দুদকের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি। তবে বায়রার আন্দোলনকারী নেতাদের অভিযোগ, এসব মূলত ডামি এজেন্সি এবং এর নেপথ্যে সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা প্রভাবশালীরা রয়েছেন।

বায়রার সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সদ্য সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রিয়াজ উল ইসলাম দাবি করেছেন, এবারকার সিন্ডিকেটের কারণে শ্রমিকপ্রতি সাড়ে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা অভিবাসন ব্যয় হতে পারে।

এফডব্লিউসিএমএস ঘিরে মূল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ার নাগরিক আমিনুল ইসলাম বিন আবদুল নূর মালয়েশিয়ার এফডব্লিউসিএমএস পরিচালনাকারী বেস্টিনেটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। বাংলাদেশে তার প্রতিনিধি বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন স্বপন।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, আমিনুল ইসলাম মালয়েশিয়ার বৈদেশিক শ্রমিক ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি নিয়ন্ত্রণ করেন। বায়রার সাবেক মহাসচিব ও ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন সিন্ডিকেট ফি সংগ্রহ করতেন বলেও সেখানে উল্লেখ করা হয়।

আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মানব ও অর্থ পাচারের মামলা রয়েছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে রুহুল আমিন স্বপন বিদেশে আত্মগোপনে আছেন। তার এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার হয়েছে, তার বিরুদ্ধে মামলা চলমান এবং দুদক তদন্ত করছে।

বায়রার সদ্য সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, এফডব্লিউসিএমএসের মালিক ও তার অংশীদাররা এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা। তার দাবি, এই শ্রমবাজার বারবার গুটিকয়েক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।

তবে প্রবাসী কল্যাণ সচিব মো. মোখতার আহমেদ গত বুধবার বলেছেন, মালয়েশিয়ার বন্ধ থাকা শ্রমবাজারকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তা পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। এ সুযোগে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যাতে ফায়দা নিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মোখতার আহমেদ আরও বলেছেন, মালয়েশিয়া সরকার কী পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেবে, সে বিষয়ে নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত এফডব্লিউসিএমএস বা বেস্টিনেটকে মূল্যায়ন করা হবে না। এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়া সরকারের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

সহযোগী এজেন্সি নিয়েও তৈরি হয়েছে প্রশ্ন

২৫টি এজেন্সির প্রতিটির সঙ্গে ১০টি করে সহযোগী এজেন্সি দেওয়া হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের সঙ্গে রাখা হয়েছে ৬২টি সহযোগী এজেন্সি। তবে ৩১২ সহযোগী এজেন্সি প্রধান এজেন্সি বা বোয়েসেলের অনুমোদন ছাড়া কর্মী পাঠাতে পারবে না।

অন্তত ১০টি সহযোগী এজেন্সির মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কেউ সহযোগী এজেন্সি হিসেবে কাজ করবেন না বলে জানিয়েছেন। আবার কেউ বলেছেন, এ বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না।

বোয়েসেলের নির্বাহী পরিচালক (যুগ্ম সচিব) মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি। মালয়েশিয়া থেকেও তারা কোনো তথ্য পাননি। এফডব্লিউসিএমএস সফটওয়্যারে বোয়েসেলের সঙ্গে সহযোগী এজেন্সিগুলোর নাম দেওয়া আছে। তবে এসব এজেন্সি কীভাবে তাদের সঙ্গে কাজ করবে, তা তারা বুঝতে পারছেন না।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেছেন, শ্রমিকদের স্বার্থ ও সুরক্ষার বিষয়টি এখানে উপেক্ষিত। তার অভিযোগ, শ্রমিকদের জিম্মি করে কিছু লোক অর্থ উপার্জনের সুযোগ নিচ্ছে। তার মতে, এ ধরনের সিন্ডিকেট কোনোভাবেই হওয়া উচিত নয় এবং বিষয়টি সরকারের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা।