কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। কোনো এলাকায় এ ধরনের মিছিল হলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও এলাকার উপপুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) দায় নিতে হবে বলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এরই মধ্যে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। ফলে কখন কোথায় ঝটিকা মিছিল হবে এবং এর জন্য কাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে, তা নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা চলছে। অনেক কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধানসহ পুলিশের ১১ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে।
এদিকে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ঝটিকা মিছিলের দায় ওসিদের ওপর
সম্প্রতি পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, কোনো এলাকায় আওয়ামী লীগের লোকজন ঝটিকা মিছিল করলে এর দায় সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও এলাকার ডিসিকে নিতে হবে।
এরপর গুলশানে ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় গুলশান বিভাগের ডিসি এম তানভীর আহমেদকে ডিএমপি সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে গুলশান থানার ওসি মো. দাউদ হোসেনকেও প্রত্যাহার করা হয়। তবে সংযুক্তির আদেশে সরাসরি ঝটিকা মিছিলের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।
অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক বিষয়ে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ঠিক নয়। পুলিশ এমনিতেই এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এ সময় এভাবে চাপ দিলে ভালো ফল হবে না। রাজনৈতিক বিষয় রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা উচিত এবং এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য বাড়িয়ে আগেভাগে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ধরপাকড় ও কড়া নজরদারির পরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কর্মকাণ্ড ঠেকানো যাচ্ছে না। সুযোগ পেলেই বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল বের করা হচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করলেও প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন করে ধরপাকড় শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারা এখন বিষয়টি শক্তভাবে মোকাবিলা করতে চান।
গোয়েন্দা তথ্য বাড়ানোর পরামর্শ
পুলিশের সাবেক আইজিপি নুরুল হুদা বলেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের কর্মকাণ্ড নিবৃত্ত করার দায়িত্ব পুলিশের। তবে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর না করে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। এ জন্য গোয়েন্দা তথ্য বাড়ানো প্রয়োজন।
তার মতে, শুধু একটি ঝটিকা মিছিল হয়েছে বলে কাউকে শাস্তি দেওয়া ঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার গাফিলতি ছিল কি না কিংবা তিনি কোনোভাবে সহযোগিতা করেছেন কি না, সেসবও বিবেচনা করা প্রয়োজন। তার ধারণা, চাপের মধ্যে রাখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ ধরনের কথা বলে থাকতে পারেন।
কয়েক দিন ধরে পুলিশের চেকপোস্ট ও টহল বাড়ানো হয়েছে। এর আগে নিরাপত্তা জোরদার-সংক্রান্ত নির্দেশনাও পুলিশের মাঠ প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়। বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)সহ বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা নিরাপত্তায় রয়েছেন।
এরপরও হুটহাট মিছিলের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সন্তুষ্ট নয়। কোনো মিছিল হলেই কেন তা ঠেকানো যাচ্ছে না, তা নিয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছে।
পুলিশের মধ্যম সারির একজন কর্মকর্তা বলেন, কয়েকজন মানুষ একত্র হয়ে মিছিল করলে তা চাইলেই একজন ওসির পক্ষে ঠেকানো সম্ভব নয়। এ কারণে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও ঠিক নয়। তার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি ও জামায়াত অনেক মিছিল করেছে, কিন্তু সে জন্য কোনো ওসি বা ডিসিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি। এ ধরনের দৃষ্টান্ত তৈরি হলে পুলিশের মনোবল আরও কমবে।
পুলিশের সাবেক আইজি আশরাফুল হুদা বলেন, কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনেক সময় অধস্তনদের বিভিন্নভাবে চাপ দেন। এটিও তেমন একটি বিষয় হতে পারে। তবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মিছিল ঠেকাতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন কি না এবং দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন কি না, তা দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বাড়িয়ে নিয়মিতভাবে ওসিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তাদের উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
এসবি প্রধানসহ ১১ কর্মকর্তার রদবদল
পুলিশের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ রেঞ্জ পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার ১১ কর্মকর্তাকে বদলি ও নতুন দায়িত্বে পদায়ন করেছে সরকার।
এর মধ্যে বিশেষ শাখা, পুলিশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, ট্যুরিস্ট পুলিশ, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল এবং ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ-১ শাখা থেকে পৃথক দুটি প্রজ্ঞাপনে এসব আদেশ জারি করা হয়।
পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. কামরুল আহসানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে এসবির প্রধান করা হয়েছে। এতদিন এসবির অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সরদার নুরুল আমিনকে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. ইকবাল হোসেনকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে নেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান। আর পুলিশ অধিদপ্তরের ডিআইজি মো. রেজাউল করিমকে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি করা হয়েছে। ফলে একই আদেশে ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে।
কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের পরিচালক ডিআইজি মো. সায়েদুর রহমানকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ অধিদপ্তরে পদায়ন করা হয়েছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের ডিআইজি মোহাম্মদ মুসলিমকে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের নতুন পরিচালক করা হয়েছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাইনুল হাসানকে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদার প্রিন্সিপাল করা হয়েছে। সারদার প্রিন্সিপাল জি এম আজিজুর রহমানকে ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি করা হয়েছে।
এসবির ডিআইজি মীর আশরাফ আলীকে রেলওয়ে পুলিশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আর মেট্রোরেলের ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমানকে এসবির ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে পরিবর্তনের কারণ হিসেবে শুধু জনস্বার্থে আদেশ জারির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অডিও ছড়ানোর পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি প্রত্যাহার
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে পুলিশ কিছুই করতে পারবে না—এমন বক্তব্যের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদের সই করা আদেশে রাকিবুল হাসানকে ডিএমপির সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশটি শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) থেকে কার্যকর হবে। এ বিষয়ে ওসি রাকিবুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওসি পরিচয়ে এক ব্যক্তিকে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর সমালোচনা করতে শোনা যায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে টাকা লেনদেনের অভিযোগও করেন তিনি।
অডিওতে ওই ব্যক্তি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গে পুলিশের সক্ষমতা নিয়ে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে বিএনপির রাজনীতি করছেন, তবে তিনি তা করছেন না।
মনির নামে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার গাড়িচালক থানার ওসি পদায়ন করছেন বলেও অডিওতে দাবি করা হয়। ওই বক্তা অভিযোগ করেন, পদায়ন পেতে কর্মকর্তারা টাকা দিচ্ছেন এবং সকালেই পদায়ন হয়ে যাচ্ছে।
ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার উদ্দেশে অডিওর বক্তা বিভিন্ন অভিযোগ করেন। তার দাবি, ওই কর্মকর্তার চাকরি ছিল না এবং বর্তমান পদে এক বছর থাকতে পারলে ১০০ কোটি টাকা হয়ে যাবে। ওসি পদায়ন প্রসঙ্গে তিনি আওয়ামী লীগের সময়কার কমিশনার এবং সাবেক আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদের আমলের পদায়ন নিয়েও বক্তব্য দেন।
ডিএমপি ও রাজধানীর থানার ওসিদের পদায়ন নিয়েও ওই ব্যক্তিকে কথা বলতে শোনা যায়। তিনি দাবি করেন, রাজধানীর থানার ওসিদের পদায়নের জন্য টাকা দেওয়া উচিত নয়।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অডিওতে ওসি রাকিবুলের কণ্ঠসদৃশ ওই ব্যক্তিকে দাবি করতে শোনা যায়, তিনি ভাটারায় একজন কর্মকর্তার জন্য একটি কাজ করে দিয়েছিলেন এবং ওই কর্মকর্তা ১ কোটি টাকা নিয়েছেন। পরে তিনি পুলিশের পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দাবি করেন, অযোগ্যদের বিভিন্ন জায়গায় পদায়ন দেওয়া হচ্ছে এবং যোগ্যদের আড়ালে রাখা হচ্ছে।
আরও পড়ুন:







