জন্মের পর মায়ের আঁচল, বাবার আদর আর আপনজনের ভালোবাসায় যে পৃথিবীর সাথে পরিচয় হওয়ার কথা ছিল, সেই পৃথিবীর প্রথম ঠিকানাই ছিল কারাগারের অন্ধকার চার দেয়াল। খেলার মাঠ কিংবা স্কুলের আঙিনার বদলে জীবনের প্রথম সাত-সাতটি বছর যাকে কাটাতে হয়েছে বন্দিশালায়, সেই নিষ্পাপ শিশুটির নাম মোবাশ্বেরা খানম রাখি।
দীর্ঘ বন্দিদশার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মা কামরুন্নাহার মনির হাত ধরে মুক্ত পৃথিবীতে পা রাখে সে। কাঁধে একটি ব্যাগ, ভেতরে তিনটি বই—যেটি নিয়ে জেলের ভেতরেই সে স্কুলে যেত। কারাগারের চার দেয়ালের ভেতর বন্দী শৈশবে কোনো খেলনা বা পুতুল কেনার সামর্থ্য না থাকায়, তার মা কামরুন্নাহার মনি তাকে মোজা এবং ফেলে দেয়া কাপড় দিয়ে একটি পুতুল বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারাগার থেকে দীর্ঘ ৭ বছর পর যখন শিশু রাখি মুক্ত বাতাসে বের হয়ে আসে, তখন তার হাতে পরম যত্নে ধরা ছিল মায়ের নিজ হাতে বানানো সেই কাপড়ের পুতুল।
কারাগারের লৌহকপাট পেরিয়ে এসে কণ্ঠ কেঁপে ওঠে কামরুন্নাহার মনির। আকুল হয়ে জানান, বাইরে থাকলে সন্তান হয়তো ভালো থাকত, কিন্তু মা ছাড়া কোনো সন্তানের জীবনই যে সম্পূর্ণ নয়।
নুসরাত হত্যা মামলার প্রেক্ষাপট
শিশুটির এই করুণ কারাজীবনের নেপথ্যে রয়েছে ২০১৯ সালের ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা। ওই বছরের ৬ এপ্রিল সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ছাদে নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হয় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় চারদিন পর তিনি মারা যান। বিচার চলাকালে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় কারাগারে পাঠানো হয় আসামি কামরুন্নাহার মনিকে।
কারাগারের নিষ্ঠুর আবহেই জন্ম হয় অবোধ শিশু মোবাশ্বেরার। কামরুন্নাহার মনি জানান, গর্ভবতী থাকায় তাকে তীব্র শারীরিক নির্যাতন না করলেও মোটা বেত দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়েছে। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে চোখের সামনে ভাইদের ওপর ইলেকট্রিক শক দেয়া, হাত ঝুলিয়ে পিটানো কিংবা নখ উপড়ে ফেলার মতো হাড়হিম করা বর্বরতা দেখেছেন তিনি। শান্তিতে ঘুমাতে কিংবা দাঁড়াতে পর্যন্ত দেয়া হয়নি; উল্টো রিমান্ডে গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে আদায় করা হয়েছিল কাল্পনিক ও মিথ্যা জবানবন্দি। বন্দিজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তাদের কাছে কেটেছে একেকটি দীর্ঘ বছরের মতো।
হাইকোর্টের রায়ে খালাস
অবশেষে সাড়ে সাত বছরের এক আইনি ষড়যন্ত্রের অন্ধকার পেরিয়ে হাইকোর্টের রায়ে পুরোপুরি খালাস পেয়ে মুক্ত আকাশে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন ১০ জন নিরপরাধ মানুষ। নিম্ন আদালত ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও, পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় বদলে যায় সেই রায়। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) মনিসহ ইমরান ও রানার মতো মোট ৮ জন কারামুক্ত হন, আর আগের দিন মুক্তি পান বাকি ২ জন। কারাগারের মূল ফটকে মুক্ত সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইমরানের মা।
ইফতেখার উদ্দিন রানা মুক্ত হয়ে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে তছনছ হয়ে গেছে পুরো পরিবার। মাথার ওপর থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে বাবার পরম ছায়া।
এদিকে পুরো ঘটনাকে সাজানো ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা বনজ কুমারের ওপর তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন কারামুক্ত মহিউদ্দিন শাকিল।
জীবনের এই অমূল্য এবং অপূরণীয় ক্ষতি কে পূরণ করবে, দৃপ্ত কণ্ঠে সেই প্রশ্ন তোলেন শাকিল।
রিমান্ডের অমানুষিক ও অমানবিক নির্যাতনের ভয়াবহ শিকারে পরিণত হয়ে অনেকেই শ্রবণশক্তি হারিয়েছেন, মেরুদণ্ডের তীব্র ব্যথাসহ শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা জটিল ব্যাধি।
কারাগার থেকে বেরিয়েই গণমাধ্যমের ওপর ক্ষোভ উগরে দেন কারামুক্ত মো. শামীম। অভিযোগ করেন, অর্থের কাছে বিকিয়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক অপপ্রচাবের বলি বানিয়ে বিনা অপরাধে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে তাদের পুরো জীবন।
বিনা অপরাধে সহ্য করা সেই রোমহর্ষক ও ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন ইমরান হোসেন মামুন।
কারাজীবনের অন্ধকূপে থাকা অবস্থায় শেষ সময়ে নিজের বাবার পাশেও থাকতে পারেননি ইমরান হোসেন। ধ্বংস হয়ে যাওয়া পারিবারিক অর্থনীতি আর জীবনের এই অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার কে নেবে, আকুল কণ্ঠে সেই বিচার চান তিনি।
কারামুক্তির পরও শতভাগ আনন্দ স্পর্শ করতে পারেনি তাদের। কারণ, তাদের আরও ৬ জন নিরপরাধ ভাই এখনো কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে বন্দি। তাদের আইনি সুরক্ষা ও মামলাটি পুনর্বিবেচনার আকুল আকুতি ব্যক্ত করেন কারামুক্ত ব্যক্তিরা।
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের প্রতি কৃতজ্ঞতা
আর সত্য ঘটনা উন্মোচনের মাধ্যমে ১০ জনের এই খালাস পাওয়াকে ন্যায়বিচারের জয় হিসেবে দেখছেন তারা। কামরুন্নাহার মনিসহ কারামুক্ত সকলেই অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের ভূমিকার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
নুসরাত হত্যা মামলায় কারামুক্তির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট ক্রিয়েটর প্রিসিলা তার এক পোস্টে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন উদ্দেশ্য করে লেখেন, সারা বাংলাদেশ যা পারল না, নিজের জীবন বাজি রেখে এক সাংবাদিক এক দেশের পুলিশের সাথে যুদ্ধ করে সত্য প্রমাণ করে দিলেন।
অন্যদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, স্বৈরাচার হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে, কারাবন্দী সবাই মারা পড়তেন। মহান আল্লাহ তাকে সত্য উন্মোচনে সামান্য ভূমিকা রাখার সুযোগ দিয়েছেন। ক্ষমতার রাষ্ট্রযন্ত্র ও তৎকালীন নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমের বিপরীতে দাঁড়াতে গিয়ে বনজ গংদের করা চারটি মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাকে। পোস্টে তুলে ধরেন ইলিয়াস হোসাইন।
হতাশা ব্যক্ত করে তিনি লেখেন, বনজদের হটিয়ে ভুক্তভোগীরা মুক্ত হলেও দেশের মিডিয়া এখনো ভারতীয় প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। দুই মাস আগে আওয়ামী লীগের এক নারী আসামির বাচ্চার জন্য যে মিডিয়া মায়াকান্না করেছিল, তারা সাত বছর কারাগারে কাটানো নিষ্পাপ শিশু মোবাশ্বেরা ও তার মায়ের জন্য এক ফোঁটা চোখের জল ফেলেনি।
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন আরো বলেন, দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে হাজারো শিশু ও পরিবারকে বলির পাঁঠা বানানোর রাজনৈতিক এজেন্ডায় এদেশের সংবাদমাধ্যম আজও রহস্যজনকভাবে উদার।
অন্যদিকে, শুরু থেকেই অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন দাবি করে আসছিলেন, নুসরাতের ঘটনা কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, স্রেফ একটি নিখুঁত আত্মহত্যার ছক।
সাংবাদিক ইলিয়াসের আলোচিত ‘ফিফটিন মিনিটস’ প্রতিবেদনে উঠে আসে, প্রেমিক মিন্টুর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু ও একাধিক প্রেমের গল্প এবং পুলিশ কর্মকর্তা শরীফকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে চরম হতাশায় ছিলেন নুসরাত।
ছেলেদের সাথে মেলামেশার জেরে অধ্যক্ষ বহিষ্কার করলে, তিন বান্ধবী মিলে সে সাজায় ইভটিজিংয়ের নাটক। সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে আগুন লাগানোর ৩ দিন আগেও সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল।
সত্য ধামাচাপা দিতে পিবিআই গায়েব করে ফেলে আশপাশের প্রায় ১০০টি সিসিটিভি ফুটেজ এবং তিনদিন গোপন রাখা হয় নিহতের মূল ‘ডায়িং ডেক্লারেশন’। রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি এবং মাকসুদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় পিবিআই।
অন্যদিকে দণ্ডপ্রাপ্ত শামীমের মোবাইল লোকেশন প্রমাণ করে, সে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৫ মাইল দূরে ছিল। ফাঁস হয় তদন্তকারী কর্মকর্তা অজিতের পুকুর থেকে বোরকা উদ্ধারের সাজানো নাটক, যিনি পরবর্তীতে নিজেই গাড়ি চাপা পড়ে মারা যান।
মাদ্রাসার দপ্তরি নুরুল আমিনকে ভয় দেখিয়ে বানানো হয় ৪ নম্বর সাক্ষী, আর আত্মহত্যার আগাম এসএমএস নিয়ে পিবিআইয়ের কাছে যাওয়া শিক্ষক আফসার উদ্দিনকে বানানো হয় ৮ নম্বর আসামি।
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নুসরাত হত্যা মামলার আসামীদের খালাস পেতে ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে অনেকে। কারামুক্তির পর, মিথ্যা মামলার ভুক্তভোগীরাও বললো সেই সত্য। তবে, দায়মুক্তি মিললেও, দীর্ঘ সাত বছর কারাভোগের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে, দ্রুত সরকারের সহায়তার প্রত্যাশায় রয়েছে ভুক্তভোগীরা।
আরও পড়ুন:







