বৃহস্পতিবার

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২ আশ্বিন, ১৪৩৩

কাদের মোল্লার ফাঁসি যেভাবে ষড়যন্ত্র চালায় ভারত

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:৪১

শেয়ার

কাদের মোল্লার ফাঁসি যেভাবে ষড়যন্ত্র চালায় ভারত
ছবি বাংলা এডিশন

আব্দুল কাদের মোল্লা-যেই নামটি এক মজলুম জননেতা হিসেবে উঠে আসে ইতিহাসের পাতায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে প্রাণ হারান তিনি। বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেই মানুষটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল, সেই কাদের মোল্লার মৃত্যুকে ঘিরে ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ে আজও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন, বিতর্ক ও আলোচনা।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

জানা যায় ফরিদপুরের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম আব্দুল কাদের মোল্লার। বাবা সানাউল্লাহ মোল্লা, মা বাহেরুন্নেসা বেগম। ১৯৪৮ সালের ১৪ আগস্ট সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ এলাকার জরিপের ডাঙ্গী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ সন্তান ছিলেন কাদের মোল্লা।

১৯৫৮ সালে প্রাথমিক বৃত্তি লাভের পর ১৯৫৯ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন আব্দুল কাদের মোল্লা—এমন তথ্যও পাওয়া যায় বিভিন্ন সূত্রে। ১৯৬৮ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করার পর ১৯৬৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পড়তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি।

ছাত্রজীবনেই ইসলামী ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কথাও উঠে আসে বিভিন্ন সময়। পরবর্তীতে ইসলামী ছাত্রসংঘের শাহিদুল্লাহ হল ইউনিটের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন বলেও তথ্য পাওয়া যায়। আদালতে দেয়া নিজের সাক্ষ্যেও কাদের মোল্লা ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রসংঘের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং শাহিদুল্লাহ হল ইউনিটের সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা উল্লেখ করেছিলেন।

জাতীয় রাজনীতিতে আব্দুল কাদের মোল্লা ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। কিন্তু সদরপুরের মানুষের স্মৃতিতে তাঁর পরিচয় কিছুটা আলাদা। তাঁদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ তরুণ, একজন মেধাবী ছাত্র, এক উদ্যমী শিক্ষক এবং গ্রামের সবার প্রিয় একজন মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে বিতর্ক ও অভিযোগ

তবে, কাদের মোল্লাকে বিতর্কিত করা—১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে। কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে, হাসিনার আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর প্রহসনের বিচার হয়। মঙ্গলবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ২০১৩ সালে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে ছয়টি অভিযোগের মধ্যে পাঁচটিতে দোষী সাব্যস্ত করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়; এর মধ্যে দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এবং সর্বশেষ সাজা হিসেবে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় তাকে।

তবে তাঁর পরিবার, স্থানীয়দের একটি অংশ এবং সমর্থকদের দাবি—এই অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করেছে। তাঁদের ভাষ্যে, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই কাদের মোল্লাকে বিচারের মুখোমুখি করে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল।

আর এখানেই যেন প্রশ্নের ধোঁয়াশাময় তীর—যেই অপরাধের দায়ে কাদের মোল্লাকে ফাঁসির রায় দেয়া হয়েছিল, তিনি কি আসলেই সেই অপরাধের আসামি ছিলেন? নাকি রাজনৈতিক আক্রোশ, দলীয় বৈরিতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের এক গভীর ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে তাঁকে ঠেলে দেয়া হয়েছিল মৃত্যুর এক গভীর কূপে?

স্থানীয়দের দাবি, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন না; বরং সদরপুরের আমিরাবাদেই অবস্থান করেছিলেন তিনি। এমনকি সে সময় বাইশরশির ধলা মিয়া পীর সাহেবের বাড়িতে কাদের মোল্লার অবস্থানের তথ্যের পাশাপাশি তাঁর সন্তানদের পড়ানোর কথাও উঠে আসে স্থানীয়দের বক্তব্যে।

অপরদিকে কাদের মোল্লার পরিবার ও তাঁর এলাকাবাসীর দাবি, তিনি যুদ্ধাপরাধী ছিলেন না; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সাজানো মামলার মাধ্যমে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল।

শাহবাগ আন্দোলন ও আইন সংশোধন

জানা যায়, মঙ্গলবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। কিন্তু এই রায়ের পরই তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে শাহবাগে শুরু হয় গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন।

এরপরই যেন বদলে যেতে থাকে পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার গতিপথ। তথ্য বলছে, শাহবাগের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইনে সংশোধন আনা হয়, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপক্ষকে দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করে সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষের এমন সুযোগ ছিল না। সংশোধনীটি রবিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) ২০১৩ পাস হয় এবং সেটিকে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে ধরা হয়। কাদের মোল্লার মামলাতেই এই সংশোধিত বিধানের প্রয়োগ ঘটে।

কিন্তু বিতর্কের কুয়াশাময় অধ্যায় যেন এখানেই। বিচারাধীন একটি মামলার রায়ের পর রাজপথের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আইন সংশোধন করে, সেই সংশোধনী আবার সংশ্লিষ্ট মামলায় প্রয়োগ—বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসনের বিচারে সেটি কতটুকু যুক্তিযুক্ত? এই প্রশ্নই সামনে আসে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও আইন বিশেষজ্ঞ মহলেও।

এই সংশোধিত আইনের সুযোগেই রাষ্ট্রপক্ষ কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজা ও খালাসের অংশের বিরুদ্ধে আপিল করে সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে। রাষ্ট্রপক্ষের আপিলের পর মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ২০১৩ আপিল বিভাগ তাঁর যাবজ্জীবন সাজা পরিবর্তন করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালে খালাস পাওয়া একটি অভিযোগেও আপিল বিভাগ ভিন্ন সিদ্ধান্ত দেয়। আর এখানেই কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের বিতর্ক যেন আরও ঘনীভূত হয়।

ভারতের যোগসাজশ নিয়ে অভিযোগ

তবে কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি অধ্যায় ভারতের যোগসাজশ নিয়ে। তাঁর পরিবার ও সমর্থকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়, তৎকালীন সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং হিন্দুত্ববাদী ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব এই বিচারপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি তাঁর ফাঁসি কার্যকরের ক্ষেত্রেও ভারতের প্রত্যক্ষ প্রভাব বা নির্দেশ ছিল—এমন দাবিও করেন তাঁর সমর্থকদের কেউ কেউ।

ফাঁসি কার্যকর

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে শেষ মুহূর্তের আইনি লড়াই, রিভিউ আবেদন, স্থগিতাদেশ ঘিরে নাটকীয়তা—সবকিছু পেরিয়ে বৃহস্পতিবার (১২ ডিসেম্বর) ২০১৩ রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে কার্যকর হয় আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় একটি মানুষ চলে গেলেই কি তাঁর সঙ্গে থাকা সব প্রশ্ন শেষ যায়? কাদের মোল্লার গ্রামের মাটিতে ফিরে আসা সেই মরদেহ যেন আজও রেখে গেছে সেই অমীমাংসিত প্রশ্নই। ফাঁসির দড়িতে ঝুলে কি সত্যিই শেষ হয়ে যায় একটি বিচার? নাকি সময়ের আদালতে কিছু প্রশ্ন আরও দীর্ঘজীবী হয়ে ওঠে?