একই দেশ, একই সীমান্তরক্ষী বাহিনী-কিন্তু দুই ভিন্ন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সীমান্তে যেন তাদের আচরণেও দেখা যায় বিরাট ভিন্নতার ছাপ।
ভারতের বিএসএফের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সীমান্তে বছরের পর বছর গুলি, নির্যাতন ও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করতে দেখা যায়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যেও উঠে এসেছে বহু বাংলাদেশির প্রাণহানির হিসাব। অথচ পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত বাস্তবতা, সংঘাতের ধরন এবং সামরিক সমীকরণ যখন একেবারেই ভিন্ন। তখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক— দুই দেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত আচরণে কেন এমন পার্থক্য?
বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাণহানির হিসাব
২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত—এই এক দশকে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফের হাতে ৯০০-এর বেশি বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের অনুসন্ধানে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে অতিরিক্ত ও নির্বিচার শক্তি প্রয়োগ, নির্যাতন এবং জবাবদিহির ঘাটতির কথাও তুলে ধরা হয়।
এরপরও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় থামেনি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ। বাংলাদেশি মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ থেকে ২০২০—পরবর্তী এই এক দশকে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন ২৭৩ বাংলাদেশি। অপরদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত সীমান্তে আরও ১০৯ জন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে মারা যান।
এছাড়াও শুধু ২০২৫ সালেই সীমান্ত সহিংসতায় ৩৪ জন বাংলাদেশির প্রাণ হারানোর ঘটনা উঠে আসে বিভিন্ন তথ্যে। এর মধ্যে ২৪ জন গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনের পর মারা যান বলেও জানা যায়। মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক হিসাবেও সীমান্তে গুলিতে ও নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত থাকার চিত্র উঠে এসেছে।
সেই সঙ্গে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত আসকের হিসাবে বিএসএফ-সংশ্লিষ্ট সীমান্ত ঘটনায় প্রাণ হারান আরও ১০ বাংলাদেশি—এর মধ্যে ৭ জন গুলিতে এবং ৩ জন শারীরিক নির্যাতনে জীবন হারানোর ঘটনাও উঠে আসে।
সর্বশেষ চলতি সেপ্টেম্বরেও এসেছে একজনের মৃত্যুর খবর। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যমে নিহতের মরদেহ বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয় বলেও তথ্য রয়েছে।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড
বিএসএফের বিতর্কিত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হয়ে আছে ফেলানী হত্যাকাণ্ড। ২০১১ সালে কিশোরী ফেলানীর মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকার ঘটনায় সে সময়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়েই সৃষ্টি হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা সেই নিথর দেহ যেন এক মুহূর্তে দৃশ্যমান করে তোলে সীমান্তবাসীর দীর্ঘদিনের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা।
পাকিস্তান সীমান্তের ভিন্ন বাস্তবতা
এই নির্মম বাস্তবতার মাঝেই সামনে আসে আরেকটি প্রশ্ন— বাংলাদেশ সীমান্তেই কেন এত প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের ঘটনা সামনে আসে? এর বিপরীতে পাকিস্তান সীমান্তে ভারতের আচরণ ও সীমান্ত বাস্তবতা কতটা ভিন্ন—সেটিই এখন সময়ের বড় প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক তথ্য বলছে, ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের বাস্তবতা বাংলাদেশের চেয়ে মৌলিকভাবেই আলাদা। উভয় দেশই পারমাণবিক অস্ত্রধারী। পাশাপাশি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ ও সামরিক সংঘাতের ইতিহাস রয়েছে। ফলে দুই দেশের সীমান্তে যেকোনো বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা দ্রুতই বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় সংঘাতে রূপ নেয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গত ২০২৫ সালের মে মাসের সংঘাতও বিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলন্দাজ হামলার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। চার দিনের ওই সংঘাতে দুই দেশের সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ব্যাপক ড্রোন ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে আসে, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত ১০ মে দুই দেশ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও এর পরপরই সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের খবরও আসে।
দুই সীমান্তে কৌশলগত হিসাব ভিন্ন
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে ভারতের সামনে রয়েছে পারমাণবিক প্রতিরোধ, সামরিক পাল্টা-আঘাতের ঝুঁকি এবং পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের আশঙ্কা। অপরদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই সমীকরণ পুরোপুরিই ভিন্ন।
কারণ, হিসেবে উঠে আসে বাংলাদেশ পারমাণবিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের ইতিহাসও নেই। প্রায় ৪ হাজার ৯৫ কিলোমিটার সীমান্তের বড় অংশ আবার ঘনবসতিপূর্ণ।
সেই সাথে সীমান্তের দুই পাশে মানুষের কৃষিকাজ, জীবিকা, আত্মীয়তা এবং অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে একই বিএসএফ হলেও দুই সীমান্তে ভারতের কৌশলগত হিসাব এক নয়—এমন একটি ব্যাখ্যা নিরাপত্তা বিশ্লেষণে উঠে আসে।
তবে, সীমান্ত ও দুই দেশের যুদ্ধ-সমীকরণ ভিন্ন হওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের বৈধতা তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন শুধু সীমান্ত হত্যা বন্ধের নয়—দুই দেশের শক্তির অসমতার মধ্যেও কীভাবে নাগরিকের জীবন সুরক্ষিত করা যায়, সেটিও এখন সময়ের বড় দাবি।
বিশ্লেষকদের মতে, এর জন্য প্রয়োজন সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, প্রতিটি মৃত্যুর স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, অনুসন্ধান এবং দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি সীমান্তের মানুষের বৈধ জীবিকা, বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি। কারণ সীমান্ত শুধু কাঁটাতারের রেখা নয়—এর দুই পাশে বসবাস করে মানুষ; তাদের জীবন, জীবিকা, সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎও জড়িয়ে থাকে সেই সীমান্তের সঙ্গে।
আরও পড়ুন:







