চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশে নারীর ধর্ষণের ৪০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জনকে এবং ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ১৫২টি। এ সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ৬০৬টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২৪১টি শিশু ধর্ষণ ও ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে। নারী ও কিশোরীদের যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ১৯১টি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ শীর্ষক অংশীজন সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এ সংলাপের আয়োজন করে।
সংলাপে সভাপতিত্ব করেন আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান। তিনি জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
মানব পাচারে পাঁচ হাজারের বেশি মামলা বিচারাধীন
মানব পাচারের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তাহমিনা রহমান। তিনি জানান, ২০২৫ সালে মানব পাচার-সংক্রান্ত ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিচারাধীন বা তদন্তাধীন মামলা ছিল ৫ হাজার ২৮৪টি।
১৮ লাখের বেশি মানুষ আইনগত সহায়তা পেয়েছেন
সংলাপে উপস্থাপিত মূল নিবন্ধে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন।
এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্ট আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ৩১ হাজার ২২২ জন এবং দেশের ৬৪টি জেলা আইনগত সহায়তা কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন সেবা পেয়েছেন।
তবে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, আইনগত সহায়তার আবেদন প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ। একাধিক অনুমোদনের ধাপ, নিয়মিত সভা না হওয়া এবং আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের জটিলতার কারণে সেবা পেতে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়। অস্বচ্ছল বিচারপ্রার্থীদের জন্য এই ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
ওসিসিতে সমন্বিত সেবার ঘাটতি
সংলাপে বলা হয়, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য দেশে ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি) ও সেল রয়েছে। তবে সব কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক, আইনগত, মনোসামাজিক সহায়তা ও পুনর্বাসনের সমন্বিত সেবা নিশ্চিত করা যায়নি।
অনেক কেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা সেবা, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক ল্যাব ও পৃথক কাউন্সেলিংয়ের স্থানও পর্যাপ্ত নয় বলে সংলাপে উল্লেখ করা হয়।
সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা ও সহায়তা চালু থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়, সহজে প্রবেশাধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনে ঘাটতি রয়েছে বলে বক্তারা জানান। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ আইনগত সহায়তা ও সুরক্ষা সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না জানায় প্রয়োজনের সময় এসব সেবা নিতে পারেন না।
অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকারের তাগিদ
বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ রেজমিন সুলতানা বলেন, নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘিত না হওয়াই প্রকৃত সুরক্ষা। তবে অধিকার লঙ্ঘিত হলে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সংলাপে জিএফএ কনসাল্টিং গ্রুপের নাগরিকতা, সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড প্রকল্পের ডেপুটি টিম লিডার ক্যাটরিনা কইনিগ, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার লিজা বেগম, মহিলা ও শিশু বিষয়ক অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা আইভি আক্তার, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির কোঅর্ডিনেটর ডা. তাইয়েবা সুলতানা এবং নারীপক্ষের প্রোগ্রাম ম্যানেজার কামরুন্নাহারসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
সংলাপে নারী, শিশু, যুব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সেবা আরও সহজলভ্য ও সমন্বিত করার বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
আরও পড়ুন:







