বৃহস্পতিবার

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২ আশ্বিন, ১৪৩৩

অপার সম্ভাবনা থাকলেও কেন গ্যাস-তেল উত্তোলন করে না বাংলাদেশ?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:২৮

আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯:৪৪

শেয়ার

অপার সম্ভাবনা থাকলেও কেন গ্যাস-তেল উত্তোলন করে না বাংলাদেশ?
ছবি সংগৃহীত

অপার সম্ভাবনা থাকলেও কেন গ্যাস-তেল উত্তোলন করে না বাংলাদেশ? ভারতের ছকে অকেজো রাখা হয়েছে বাংলাদেশের গ্যাসক্ষেত্র! ভারতের নীরব ডাকাতি। লালমাই পাহাড় থেকে কাঁচা তেল ও গ্যাসের সন্ধান মিললেও রহস্যজনকভাবে বন্ধ কাজ।

উপরে সীমানা প্রাচীর, টহল কিংবা কাঁটাতার, যার মাধ্যমে আঁকা হয় দুটি দেশের মানচিত্র। কিন্তু মাটির শত শত মিটার গভীরে? সেখানে নেই কোনো প্রহরা, নেই কোনো রাজনীতি বা ভূ-তাত্ত্বিক সীমানা।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত। দীর্ঘদিন ধরে যা কেবল কাঁটাতার, চোরাচালান কিংবা সীমান্ত হত্যার এক রক্তাক্ত প্রান্তর হিসেবেই পরিচিত। মাটির ওপরে যখন বন্ধুত্বের মোড়কে আধিপত্য বিস্তারের খেলা চলেছে, ঠিক তখনই মাটির নিচে চলেছে আরেক নীরব ডাকাতি।

দীর্ঘদিন ধরেই যেন ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত মানেই কেবল কাঁটাতার, সীমান্ত হত্যা কিংবা চোরাচালানের গল্প। তবে অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিনের কৌশলগত চাপ ও রাজনৈতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে, বর্ডারের ওপার থেকে সুকৌশলে বাংলাদেশের মহামূল্যবান গ্যাস ও খনিজ সম্পদ শুষে নিচ্ছে প্রতিবেশী দেশটি। বিশেষ করে, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের আমলে এই প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।

মাটির নিচে নেই কোনো কাঁটাতারের বেড়া, নেই কোনো রাজনৈতিক সীমানা। আর ভূ-তত্ত্বের এই শাশ্বত নিয়মটিই এখন বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সীমান্তঘেঁষা গ্যাসক্ষেত্রগুলো অকেজো

বিশ্লেষকরা বলছে, গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে নিজেদের ওপর পরনির্ভরশীল করে রাখার এক সুচতুর ভূ-রাজনৈতিক ছক এঁকেছিল ভারত। আর সেই নীল নকশার সবচেয়ে বড় বলি, দেশের সীমান্তঘেঁষা সম্ভাবনাময় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো।

ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের নিজস্ব খনিগুলোকে অকেজো করে রেখে, ওপার থেকে নীরবে তা শুষে নেয়া হয়। যা শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞরা।

লালমাই পাহাড়ে অনুসন্ধান ও বন্ধ

কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের মাটির নিচে কী আছে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে ঘুরছে নানা গল্প। স্থানীয়দের দাবি, একসময় এই পাহাড়ে এমনভাবে তেলের সন্ধান মিলেছিল যে কূপের আশপাশ থেকে সুতি কাপড়ে ভিজিয়ে ভিজিয়ে কাঁচা তেল সংগ্রহ করা যেত। ছিল বিপুল পরিমাণ গ্যাসের উপস্থিতি।

২০০৪ সাল থেকে লালমাই পাহাড়ে অনুসন্ধান ঘিরে নানা তৎপরতা শুরুর পর ২০১৭-২০১৮ সালে ‘লালমাই-১’ ও ‘লালমাই-২’ নামে দুটি কূপ খনন করা হয়।

অনুসন্ধানে তেল ও গ্যাসের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিললেও, রহস্যজনক কারণে হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয় উত্তোলনের পুরো কার্যক্রম।

কসবা তারাপুর গ্যাসক্ষেত্র

লালমাই পাহাড়ের একই ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর ধারাবাহিকতায় উঠে আসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্ত। ২০১৮ সালে স্থানীয়দের ভিটেমাটি অধিগ্রহণ করে কসবার তারাপুর গ্যাসক্ষেত্রে ৩ হাজার মিটার গভীরে ড্রিলিং করে বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পায় বাপেক্স।

কিন্তু, অভিযোগ রয়েছে, ১০ জন ভারতীয় তথাকথিত প্রকৌশলী এবং তৎকালীন আওয়ামী সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সরাসরি হস্তক্ষেপে একটি গোপন চুক্তি হয়, যেখানে শর্ত দেয়া হয় আগামী ৫ বছর এই কূপ থেকে বাংলাদেশ গ্যাস তুলতে পারবে না।

জানা যায়, ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে হঠাৎ একদিন বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে বিকট শব্দে শোঁ শোঁ করে গ্যাস বের হতে থাকলে আতঙ্কে দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা কর্মীরা বাইরে সরে আসে।

পরবর্তীতে ফিল্ড ইনচার্জ প্রকৌশলী তৌহিদুর রহমান তিতাস গ্যাস থেকে বিশেষজ্ঞ টিম এনে ৪-৫ ঘণ্টার চেষ্টায় সিমেন্ট প্লাগ ও নতুন ক্রিসমাস-ট্রি বসিয়ে কূপটি সিল করে দেন।

২০২৪ সালের ১৯ ও ২০ আগস্ট কসবা রেলওয়ে স্টেশন রোডে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ‘কসবার গ্যাস কসবায় চায়’ শীর্ষক বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে।

অভিযোগ উঠেছে, সীমান্ত ঘেঁষা এই প্রকল্পটিতে স্থানীয়দের বাদ দিয়ে ভারত থেকে লোক এনে কাজ করানো হয়েছে। এমনকি পরবর্তীতে ভারতের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাবের কারণেই প্রকল্পটি আলোর মুখ দেখতে পায়নি, এমনটাই দাবি বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর।

এ বিষয়ে জানতে তারাপুর গ্যাসফিল্ড এডমিন কামালের সাথে মুঠোফোনে একাধিবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, কসবা ও কুমিল্লা সীমান্তের ৫০০ গজের ঠিক বিপরীতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কূপগুলো থেকে দিনরাত গ্যাস তোলা হয়।

শালবাহান ও ধলিয়া গ্যাসক্ষেত্র

একই চিত্র উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের শালবাহানেও। ১৯৮৮ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী রাষ্ট্রপতি এরশাদ উদ্বোধনের পর ফরাসি কোম্পানি ‘ফরাসেল’ মাত্র ৭ দিনের মাথায় রহস্যজনকভাবে কাজ বন্ধ করে চলে যায়। স্থানীয়দের ১০ একর জমি লিজ নিয়ে কূপের মুখ সিমেন্ট দিয়ে ঢেকে দেয়া হলেও দীর্ঘ ৩৭ বছরেও এই রহস্যের জট খোলেনি। তবে একই বেল্টে অবস্থান থাকায় বাংলাদেশের অংশে খনন বন্ধ রেখে ভারতের জলপাইগুড়ির রাজগঞ্জে ঠিকই তেল উত্তোলন শুরু করে ওই ফরাসি কোম্পানি।

অন্যদিকে, ১৯৮১ সালে আবিষ্কৃত ফেনীর ধলিয়া গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রতিদিন ২০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেয়া হতো। কিন্তু ২০০৫ সালের ছাতক বিস্ফোরণ ও নাইকো মামলার অজুহাতে দুই দশক ধরে এটিকে পরিত্যক্ত রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ভৌগোলিক সুবিধায় ওপারকে সুবিধা দিতেই ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারের আমলে এটি অচল করা হয়।

সমুদ্রেও একই ফাঁদ

স্থলভাগের মতো একই ফাঁদ তৈরি করা হয় সমুদ্রেও, ২০১২ সালে বঙ্গোপসাগরের দুটি ব্লকের দায়িত্ব পেয়েও ভারতের ওএনজিসি ও অয়েল ইন্ডিয়া ১৪ বছরে এক ফুট গ্যাস খুঁজে পায়নি। অথচ, নিজেদের সীমানায় কৃষ্ণা গোদাবরী বেসিন থেকে বছরে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ঠিকই তুলে নিচ্ছে তারা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ গ্যাস না তুললে তা কীভাবে ভারতে চলে যায়? উত্তর লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের এক ভয়ংকর কৌশলে। ১৯৯০ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধে কুয়েতের বিরুদ্ধে মাটির নিচ দিয়ে চতুর কৌশলে তেল চুরির যে অভিযোগ উঠেছিল, ঠিক একইভাবে সীমান্তজুড়ে শক্তিশালী পাম্প বসিয়ে ‘লো প্রেসার জোন’ বা নিম্নচাপ বলয় তৈরি করেছে ভারত।

বিজ্ঞান বলে, গ্যাস সবসময় উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে নিম্নচাপের দিকে ধাবিত হয়। ফলে বাংলাদেশের লালমাই, কসবা, শালবাহান বা ফেনীর মতো খনিগুলো অকেজো পড়ে থাকায়, প্রাকৃতিকভাবেই মাটির নিচের গ্যাস প্রতিবেশী দেশের পাইপে টেনে নেয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে, মিয়ানমার পশ্চিমাদের ভয় না পেয়ে চীনের সাথে হাত মিলিয়ে গভীর সমুদ্রে ১০৯ টিসিএফ গ্যাসের বিশাল সন্ধান পেলেও, বাংলাদেশ কেবল কূটনৈতিক ও নীতিগত স্থবিরতায় পিছিয়ে পড়েছে।

অর্থনীতিতে চরম মূল্য

নিজস্ব গ্যাস উত্তোলন না করার চরম মূল্য চোকাচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বাধ্য হয়ে চড়া দামে এলএনজি আমদানি করতে গিয়ে প্রতি বছর গচ্চা যাচ্ছে প্রায় ৬০- ৯০ হাজার কোটি টাকা।

তবে আশার কথা হলো, কসবা তারাপুর খনিতে চীন থেকে আনা ৭০ কোটি টাকার নতুন খননযন্ত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। রিগটি অন্য কোথাও না সরিয়ে কসবা ও লালমাই বেল্টে পরীক্ষামূলক রি-ড্রিলিং করলে বাপেক্সের কোটি কোটি টাকার শিফটিং খরচ, ৩ মাসের মূল্যবান সময় এবং যানবাহনের বহু জ্বালানি খরচ সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে দ্রুত জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।

তবে দীর্ঘ অন্ধকারের পর এবার নড়েচড়ে বসেছে বর্তমান প্রশাসন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি গ্রহণ করে ভারতের একচেটিয়া প্রভাব ও ১৪ বছরের স্থবিরতা ভাঙতে, চীনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বঙ্গোপসাগর ও লালমাই-কসবাসহ সীমান্ত খনিগুলো থেকে নিজস্ব সম্পদ উত্তোলনের এক মেগা মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেয়া হয়েছে।

ভূতাত্ত্বিক সুবিধা নিয়ে পরিচালিত নীরব চক্রান্ত কাটিয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা এই অমূল্য সম্পদ কি শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হবে? সেই উত্তরের অপেক্ষাতেই এখন গোটা দেশ।