মঙ্গলবার

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩

কেন ছিঁড়ে ফেলা হলো জিন্নাহর ছবি?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৫৩

শেয়ার

কেন ছিঁড়ে ফেলা হলো জিন্নাহর ছবি?
ছবি সংগৃহীত

মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ইতিহাসের পাতায় যার নাম উঠে আসে একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে। উপমহাদেশের কোটি মুসলমানের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও অধিকারের দাবিকে সামনে রেখে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে, যার নেতৃত্বেই জন্ম নেয় তৎকালীন পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান। সেই জিন্নাহকেই আজ যেন দাঁড় করানো হয়েছে ইতিহাসের অগ্নিপরীক্ষায়।

ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত জিন্নাহর ছবি ফ্রেম থেকে নামিয়ে ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের ছাত্র আবু তৈয়ব হাবিলদার। শুধু তাই নয়, জিন্নাহকে খলনায়ক হিসেবে কটাক্ষ করতেও দেখা যায় আবু তৈয়বকে। সেই সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের এক ঘৃণ্য চরিত্র হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে জিন্নাহকে।

ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে সৃষ্টি হয় তুমুল বিতর্ক। আর এই বিতর্কের মাঝেই উঠছে আরও একটি জোরালো প্রশ্ন—জিন্নাহ যখন ১৯৪৮ সালেই মারা গেছেন, তখন ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হিসেবে উল্লেখ করাটা কতটা যুক্তিযুক্ত?

আবু তৈয়বের পরিচয়

এই বিতর্কের মাঝেই উঠে আসে ডাকসুর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা ব্যক্তি আবু তৈয়বের পরিচয়। জানা যায়, আবু তৈয়ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী। ২৪ বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে ভিপি পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

সেইসঙ্গে নুরুল হক নুরের রাজনৈতিক দল গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততাও পাওয়া যায়। ২০২০ সালে বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদের ৬১ সদস্যের আংশিক কমিটিতে আবু তৈয়ব হাবিলদারকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।

ছাত্রদলের সমালোচনা

অপরদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত জিন্নাহর ছবিকে ঘিরে সমালোচনা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া একটি বিজ্ঞপ্তিতে উঠে আসে জিন্নাহর ছবিকে কেন্দ্র করে তাদের নিন্দা ও সমালোচনার ঝড়।

ডাকসুর দাবি

কিন্তু ডাকসুর দাবি ভিন্ন। ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ দাবি করেন, ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নয়, বরং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার অবস্থান তুলে ধরার জন্যই তার ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে।

জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভূমিকা

অন্যদিকে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে জিন্নাহর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক অধিকার ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবিকে সামনে রেখে দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনৈতিক ভিত্তিতে পাকিস্তান আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। অনেক বিশ্লেষকের বক্তব্য থেকেও উঠে আসে বিষয়টি।

একইভাবে, বাংলা ভাষার বিরোধীতা নিয়ে জিন্নাহ’র নাম উঠে আসা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। ১৯৪৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন জিন্নাহ। তাই, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জিন্নাহ’র নাম জুড়ে যাওয়াকে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবেই দেখছে বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

ডাকসুতে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও।

অপরদিকে, এ বিষয় নিয়ে মুখ খুলেছেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেনও। তার দাবি, ডাকসু থেকে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা একটি গভীর ষড়যন্ত্র ও ভারতের নীলনকশা।

এছাড়াও আবু তৈয়ব নামের ব্যক্তির শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যেখানে তিনি নিজেই উর্দু বিভাগে পড়ালেখা করছেন, সেখানে উর্দুভাষার প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে এমন অশোভনীয় আচরণে তার মানসিক ত্রুটি রয়েছে বলেও সমালোচনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জিন্নাহর রাজনৈতিক অবদান, দ্বিজাতিতত্ত্ব, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাঁর নেতৃত্বের ফলেই বাংলাদেশ রূপ পেয়েছে। তাই জিন্নাহকে অস্বীকার করা মানে, ইতিহাস অস্বীকার করা—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।