খণ্ড-বিখণ্ড আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কোন দিকে? ভারতের ইশারায় জয়ের বদলে আওয়ামী কাণ্ডারি শেখ সেলিম? আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন এসব প্রশ্ন চারদিকে ঘুরপাক খাচ্ছে।
২০২৬ সালের ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলে নানা অজুহাত হাসিনার। সজীব ওয়াজেদ জয়ের এই দাম্ভিকতাপূর্ণ উক্তি নিশ্চয়ই মনে আছে সবার। কিন্তু ৫ আগস্টের পর দৃশ্যপট যখন পুরোপুরি উল্টে গেল, তখন কি আসলেই শেখ পরিবার হাল ছেড়ে দিয়েছে? নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব বাঁচাতে সজীব ওয়াজেদ জয় নিজেই সুকৌশলে পিছিয়ে গেলেন? ভারতে বসে শেখ হাসিনা যখন বলছেন তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতি হবেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ঠিক তখনই শুরু হয়েছে নতুন খেলা।
তৃণমূলের পছন্দ জয়, কেন সেলিম
কারণ, তৃণমূলের রক্তচক্ষু আর পছন্দ যেখানে সজীব ওয়াজেদ জয়, সেখানে শেখ সেলিম কেন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ভূ-রাজনীতির এক গভীর সমীকরণে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছে, ভারতের কাছে নাকি জয়ের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য শেখ সেলিম। ক্ষমতার এই নোংরা কাড়াকাড়ির শেষ পরিণতি আসলে কী? ৭৫-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ চলেছে একটিমাত্র পরিবারের হাতে। কিন্তু ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে গদি হারিয়ে হাসিনা যখন ভারতে পালিয়ে গেলেন, তখন শুধু সিংহাসনই কাঁপেনি, শেখ পরিবারের অন্দরমহলও ছারখার হয়ে গেছে।
হাসিনার ফেরার নানা অজুহাত
নিজের ভারত আশ্রয় নিয়ে একের পর এক হাস্যকর নাটক তৈরি করেছেন তিনি। ভারতের এক সংবাদ মাধ্যমের সাক্ষাৎকারে খোদ শেখ হাসিনা স্বীকার করেছেন, দেশ ছাড়ার মুহূর্তে নাকি তিনি জানতেনই না যে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভেবেছিলেন টুঙ্গিপাড়ার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন, কিন্তু প্লেনে ওঠার পর জানতে পারলেন সীমান্ত পার করে তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটা দেশের টানা ১৫ বছরের প্রধানমন্ত্রী, অথচ তিনি নাকি জানতেনই না কোথায় তাকে নেয়া হচ্ছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার এক ফাঁকা বুলি ছুঁড়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য একটাই, তৃণমূলের ভেঙে পড়া নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা। কিন্তু, বিজয়ের মাস ঘনিয়ে আসতেই যখন বোঝা গেল ফেরার কোনো বাস্তব সুযোগ নেই, তখনই শুরু হলো নতুন অজুহাত। এখন তিনি বলছেন, দেশে ফিরলে নাকি এয়ারপোর্টেই তাকে হত্যা করা হতে পারে। নিজ দেশের মানুষের জীবন বিপন্ন করে নাকি তিনি ফিরতেই চান না। সাধারণ মানুষ বলছে, যে মানুষটা কিছুদিন আগে বলেছিল ডিসেম্বরে ফিরবে, সে এখন নানা বাহানা দিচ্ছে; ২০৫০ সালের ডিসেম্বরেও শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে পারবেন কিনা সন্দেহ আছে।
এই ধরনের হাস্যকর ও দায়িত্বহীন কথা আর কতো? অতীতে কোটা আন্দোলন নিয়ে কোটা থাকবে না বলে যেসব কথা তিনি দিয়েছিলেন পরে আবার কোটা রাখা, আবার দেশ থেকে পালাবে না বলে পালিয়েছেন কিংবা দেশের প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস নিয়ে যেভাবে মনগড়া তথ্য ছড়ানো হয়েছিল, এখনও ঠিক সেই একই মিথ্যাচারের পথে হাঁটছেন তিনি।
ভারতের নিয়ন্ত্রণ ও সেলিম ঘোষণা
অন্যদিকে, জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ ও ভারতের সম্পর্ক একসূত্রে গাঁথা। মুজিবুর রহমান থেকে শুরু করে হাসিনা পর্যন্ত, দল পরিচালনা কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রতিটি ধাপে ছিল ভারতের পরামর্শ ও নিয়ন্ত্রণ। তাহলে কি জয় বিদেশে থাকার কারণে এবং মার্কিন নাগরিক বা অন্য দেশের নাগরিক হয়ে যাওয়ায় ভারত তাকে আর চোখ বন্ধ করে নিয়ন্ত্রণ করতে পারত না? এই আশঙ্কা থেকেই কি ভারত নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি বাঁচাতেই শেখ সেলিমকে দলের সভাপতি ঘোষণা করার কথা বলে দিয়েছে দিল্লি? ভারতে বসে হাসিনার এই ঘোষণা কি আদতে ভারতেরই সুর ছিল?
এদিকে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে বসে থাকা আওয়ামী লীগের সুবিধভোগী নির্বাসিত নেতারা শুরু করেছেন নতুন নাটক। লন্ডনে বা নিউইয়র্কের এয়ারকন্ডিশন রুমে বসে জুম বা ফেসবুক লাইভে এসে তারা তৃণমূলকে রাজপথে নামার উপদেশ দিচ্ছেন। যে কর্মীরা দেশে মামলা ও জনরোষের মুখে পালিয়ে বেড়াতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের মাঠে নামার হুংকার ছাড়ছে নেতারা। কিন্তু পকেট ভরা নেতারা কেন বিদেশে, আর কর্মীরা কেন জেলে—এই প্রশ্ন এখন তৃণমূলের মুখে মুখে।
ভারত হস্তান্তর করবে না
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজারের এক রিপোর্টেও বেরিয়ে এসেছে আসল সত্য। ভারতের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা প্রতিনিধি দল ঢাকায় এসে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারত কোনো অবস্থাতেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে না। কারণ দিল্লিও ভালো করে জানে, তাকে ফেরানো মানে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। রাজকীয়ভাবে দেশে ফেরার কোনো সুযোগ তার নেই। তাকে ফিরতে হলে প্রিজনার এক্সচেঞ্জ বা বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় একজন কয়েদি হিসেবেই ফিরতে হবে এবং সরাসরি জেলখানায় যেতে হবে।
কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ
আর এই দলের সভাপতি ঘোষণার বাস্তব চিত্র কী? শীর্ষ নেতৃত্বের এমন বিভ্রান্তিকর ঘোষণায় দেশের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও অরাজকতা তৈরি হতে শুরু করেছে। যার প্রমাণ মিলল এই তো রাজধানীর গুলশানে হঠাৎ করেই একটি ঝটিকা মিছিল বের করে সন্ত্রাসীরা, যেখান থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে ৫টি তাজা ককটেল ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র।
কোনো রোডম্যাপ নেই, আদর্শ নেই, আছে শুধু দায়িত্বহীন বক্তব্য আর মিথ্যাচার। জয় আর সেলিমের এই টানাটানিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ অন্ধকার। জাতীয় পার্টির মতো এই দলটি কি তবে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে চিরতরে বিলীন হতে যাচ্ছে? সময়ই এর একমাত্র উত্তর বলে দেবে।
আরও পড়ুন:







