দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াত জোটের রাস্তায় নামাকে ম্যাচিউর রাজনীতির প্রমাণ মনে করেন না দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হয়নি বলে এই মুহূর্তে রাস্তায় নেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কিছুটা ইমমেচিওর রাজনীতির পরিচায়ক।
মাহফুজ আনাম বলেন, বিরোধীরা সরকারের বেকায়দার অবস্থার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের বুঝতে হবে, এই মুহূর্তে দেশ কী ধরনের সংকটের সামনে রয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের নিয়মিত পডকাস্ট সম্পাদক কহেনে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল সরকার। জামায়াতের অনেক অভিযোগ থাকলে সেগুলো পার্লামেন্টে উত্থাপন করা উচিত। পার্লামেন্টে অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি জনগণকে জানাতে হবে যে তারা বিষয়গুলো উত্থাপন করছে, কিন্তু সরকার সেগুলোতে গুরুত্ব দিচ্ছে না। সংকট কিছুটা নিরসনের পর রাস্তায় নামার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাহফুজ আনাম বলেন, দুর্বল একটি মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে সরকারকে আরও কোণঠাসা করা গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং দেশের ভালোর রাজনীতির অংশ নয়।
আঞ্চলিক সংকটে রাজপথের কর্মসূচি নিয়ে প্রশ্ন
মাহফুজ আনাম বলেন, গ্যাস ও এলএমজি কেনার জন্য বাংলাদেশকে প্রতিদিন ডলার ব্যয় করতে হচ্ছে। এই ডলার আসে রপ্তানি এবং বিদেশে কাজ করা প্রবাসীদের মাধ্যমে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও আরও বিশৃঙ্খল হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বোমা হামলা করছে এবং ইসরায়েল লেবাননে হামলা করছে। পাশাপাশি দুটি শিপিং লেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়াকে কেন্দ্র করে এখনই রাস্তায় নামার সিদ্ধান্তকে তিনি ইমমেচিওর বলে মনে করেন। তাঁর মতে, বিরোধীরা সরকারের বেকায়দার অবস্থার সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
জুলাই আন্দোলনের পর জনগণের মধ্যেও কিছু না হলে রাস্তায় নামার একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম। জামায়াতের আমিরের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, দাবি না মানলে একদফা কর্মসূচির অর্থ সরকারকে পতন ঘটানো বা পুরোপুরি বহিষ্কার করে দেওয়া। বাংলাদেশের প্রশাসন ও দেশের ভাবমূর্তির জন্য এটি গ্রহণযোগ্য কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
জুলাই সনদ নিয়ে সরকারকেও উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ
মাহফুজ আনাম বলেন, তাঁর মনে হয় না সরকার জুলাই সনদ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছে। তবে সরকারের উদ্যোগ নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ করার উপকরণ রয়েছে। তিনি সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, একটি শব্দ নিয়ে জামায়াত সরে গেছে। তারা সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কার পরিষদ চাচ্ছে। তাঁর প্রশ্ন, সংশোধন ও সংস্কার শব্দ দুটির মধ্যে এমন কী পার্থক্য রয়েছে যে এ কারণে তারা চলে যাবে।
সরকারের আরও উদ্যোগী হয়ে বিরোধীদের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি। কোন কোন ক্ষেত্রে বিরোধীদের দাবি মেনে নেওয়া যায়, সেসব জায়গায় ছাড় দেওয়ার পক্ষেও মত দেন মাহফুজ আনাম।
তিনি বলেন, সরকারের দৃষ্টান্ত খুব আশাব্যঞ্জক নয়। হিউম্যান রাইটস কমিশন ও গুম কমিশনের মতো কয়েকটি মৌলিক অধ্যাদেশ বাতিল হয়ে যাওয়ার বিষয় উল্লেখ করে তিনি মনে করেন, এসব জায়গায় সরকারের আরও ছাড় দেওয়া উচিত ছিল।
পাঁচ-ছয় মাসে সরকার পতনের দাবি নিয়ে আপত্তি
মাহফুজ আনাম বলেন, নির্বাচনের মাত্র পাঁচ-ছয় মাস হয়েছে। পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই সরকার ফেলে দেওয়ার প্রশ্ন গণতন্ত্রসম্মত হতে পারে না। পাঁচ-ছয় মাসের মাথায় সরকারকে একদফার মুখে ফেললে স্থিতিশীলতা কোথা থেকে আসবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তাঁর মতে, স্থিতিশীলতা ছাড়া বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে না।
জামায়াত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কথা বললেও এসব সমস্যার সমাধানে তাদের কোনো প্রস্তাব আছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আনাম বলেন, তাঁর জানা মতে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব নেই।
তিনি বলেন, জামায়াত সরকারকে উৎখাতের কথা বলছে এবং সরকার এটিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে এবং দুই পক্ষ থেকেই একই ধরনের বক্তব্য আসছে।
তবে সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দায়িত্বশীলতার প্রমাণ সরকারকেই দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরোধীদের সঙ্গে সমঝোতা করতে সমস্যা থাকার কথা নয়।
তারেক রহমানের পদক্ষেপে ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখছেন মাহফুজ আনাম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন পদক্ষেপে মোটামুটি ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এবং মানুষের মধ্যে সাড়া দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন মাহফুজ আনাম। তবে তাঁর দল বিএনপি তাঁর সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এর কারণ হিসেবে দলের নেতা-কর্মীদের একটি মানসিকতার কথা তুলে ধরেন মাহফুজ আনাম। তাঁর মতে, তারা দীর্ঘদিন কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, এখন পুরস্কার পাওয়ার সময় এসেছে—এমন একটি ধারণা কাজ করছে। সরকার থেকে ব্যবসা, চাকরি, ভর্তুকি বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশাও এর মধ্যে রয়েছে।
এ ধরনের মানসিকতাকে একটি রাজনৈতিক দলের জন্য আত্মঘাতী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্পর্কে মাহফুজ আনাম বলেন, ক্ষমতায় আসার পর কয়েক মাসে তাঁর নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষকে আশাবাদী করছে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে।
তবে দলের সবাই যদি পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকে, তাহলে দলনেতার সামনে থাকা বিকল্পগুলো অনেক কমে যায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আরও পড়ুন:







