বৃহস্পতিবার

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৬ ভাদ্র, ১৪৩৩

শেখ সেলিমকে ঘিরে আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের বিরোধের আভাস

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:০৩

শেয়ার

শেখ সেলিমকে ঘিরে আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের বিরোধের আভাস
ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব কে পালন করবেন, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতিমণ্ডলীর জ্যেষ্ঠতম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম দায়িত্ব পালন করবেন বলে ইঙ্গিত দেওয়ার পর দলটির ভেতরে এ নিয়ে বিরোধ ও সংকটের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে শেখ ফজলুল করিম সেলিম দায়িত্ব পালন করবেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে শেখ সেলিমকে কেন্দ্র করে দলের ভেতরে বিরোধিতা ও সংকট তৈরির আভাস পাওয়া যায়।

ভারতের কলকাতায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম এ ধরনের তথ্য প্রত্যাখ্যান করলেও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সম্প্রতি যুক্তরাজ্য থেকে দলের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যাচ্ছে দলটির সাবেক সংসদ সদস্য মো. হাবিবে মিল্লাতকে। তিনি জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা দলের সভাপতি এবং দেশে ফেরার কথা বলেছেন। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কাউকে নেতৃত্ব দেওয়া বা এ ধরনের কোনো আলোচনা দলীয় পরিমণ্ডলে হয়েছে বলে তিনি জানেন না।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাতের দাবি, দলের নেতৃত্ব নিয়ে সংকট বা দ্বন্দ্বের কোনো প্রশ্ন নেই। আওয়ামী লীগে গঠনতন্ত্রের বাইরে কিছু হয় না। শেখ হাসিনা সভানেত্রী আছেন ও থাকবেন। কোনো পরিবর্তন বা নতুন সিদ্ধান্ত হলে সেটির একমাত্র ফোরাম দলের কাউন্সিল। বর্তমানে নেতৃত্ব নিয়ে যে প্রচারণা হচ্ছে, তা পুরোপুরি গুজব বলেও দাবি করেন তিনি।

কলকাতায় দলীয় কার্যক্রমে শেখ সেলিমের সম্পৃক্ততা

কলকাতায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, শেখ সেলিমকে ভবিষ্যতে সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হবে এমন কিছু শেখ হাসিনা না বললেও তিনি সম্প্রতি দলের কার্যক্রমে সক্রিয় হওয়ায় দলের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনাসহ ভারত ও বিভিন্ন দেশে অবস্থান করা নেতাদের মধ্যে শুরুতে দীর্ঘ সময় পারস্পারিক যোগাযোগ খুবই কম ছিল।

পরে শেখ হাসিনার তৎপরতায় দলের একটি অংশ কলকাতা থেকে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর পূর্ব কলকাতার টেংরা এলাকায় বসবাস করা দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বাসায় সেখানে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়মিত বৈঠক হয়ে আসছিল।

এসব বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ কলকাতায় সক্রিয় নেতারা নিয়মিত যোগ দিতেন। কখনো কখনো ভার্চুয়ালি শেখ হাসিনাও এসব বৈঠকে অংশ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, সভাপতিমণ্ডলীর সবচেয়ে সিনিয়র সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম কলকাতার নিউটাউন এলাকায় বসবাস করলেও দলীয় এসব কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন না।

এমনকি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কলকাতা যাওয়ার পরও অনেকদিন দলীয় কোনো বৈঠকে অংশ নেননি বা নিতে পারেননি। পরে ভার্চুয়াল সভাগুলোতে শেখ হাসিনাই তাকে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেন।

সম্প্রতি শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে দলের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হলে তিনি কয়েকটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। তিনি সিনিয়র হওয়ায় বৈঠকগুলো তার নিউটাউনের বাসায় হয়েছে বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়েও দলের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগের একজন নেতার দাবি, শেখ সেলিম প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে থাকলেও দলের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হননি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময়ও তিনি বহু বছর দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার একাধিক আত্মীয় তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় থাকায় তাকে নিয়ে আস্থার সংকট রয়েছে বলেও দাবি করেন ওই নেতা।

আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা নেতৃত্বের বিষয়ে দলীয় গঠনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন মাত্র। শেখ হাসিনা অংশ নেননি এমন কিছু বৈঠকে শেখ সেলিম সভাপতিমণ্ডলীর সিনিয়র সদস্য হিসেবে সভাপতিত্ব করেছেন।

হাবিবে মিল্লাতের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা যে কাউকেই দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে দলের প্রস্তুতির বিষয় হলো শেখ হাসিনার ফেরা এবং তিনিই দলের সভাপতি আছেন। এর বাইরে দলের ভেতরে কোনো আলোচনা হয়েছে বলে তিনি জানেন না।

আওয়ামী লীগে নেতৃত্বের বিরোধের ইতিহাস

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদ বলেছেন, মূল নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব নিয়ে সংকটের উদাহরণ আগেও রয়েছে।

১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ দল হিসেবে চরম বিপর্যয়ে পড়ে। নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণে ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ (মিজান) ও আওয়ামী লীগ (মালেক) নামে ভাগ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়।

মূলত নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধের কারণেই ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। তখন তিনি বিদেশে নির্বাসনে ছিলেন। কয়েকজন নেতা দলটিকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে আওয়ামী লীগের প্রধান করা হয়।

শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরও দীর্ঘদিন দলের সিনিয়র নেতাদের মধ্যে বিরোধ স্পষ্ট ছিল। দলের অন্যতম নেতা আব্দুর রাজ্জাক তখন আলাদা রাজনৈতিক দল বাকশাল সক্রিয় রেখেছিলেন। পরে ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে তিনি বাকশাল বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন।

এরপর ক্রমান্বয়ে দলটিতে শেখ হাসিনার একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও ২০০৭ সালে বাংলাদেশে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে সংস্কার ইস্যুতে আবার নেতৃত্বের বিরোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।

শেখ হাসিনা জেলে থাকা অবস্থায় দলের ভেতরে সংস্কার ইস্যুতে কয়েকজন সিনিয়র নেতা সামনে আসেন। তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার পর দলে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় হয়।

এরপর ২০০৯ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও ওই সিনিয়র নেতাদের মন্ত্রিসভায় নেননি শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন দলটির একক নেতা এবং নিজের মতো করে দলের সাংগঠনিক কাঠামো সাজিয়েছিলেন।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও দলের ভেতর থেকে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি। তবে শেখ হাসিনা তার অনুপস্থিতিতে দলের সভাপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে শেখ সেলিমের নাম উল্লেখ করায় দলের ভেতরে অসন্তোষের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

অধ্যাপক ড. সাব্বীর আহমেদের মতে, নেতৃত্ব যদি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত না হয়, তাহলে যেকোনো সময় এ নিয়ে দ্বন্দ্ব, সংকট বা গ্রুপিং তৈরি হতে পারে। শেখ সেলিমের বিষয়টি সত্য হলে আওয়ামী লীগেও তা নিয়ে সংকটের আশঙ্কা থাকা স্বাভাবিক।