চলতি বছরের ডিসেম্বরে, দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে একরকম ফাঁকা বুলি ছড়িয়েছিলেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। উদ্দেশ্য ছিল, তৃণমূলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা। কিন্তু বিজয়ের মাস ঘনিয়ে আসতেই সুর বদলাতে শুরু করেছেন তিনি।
দ্য ওয়ালে দেওয়া সাক্ষাৎকার
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল-এ দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, দেশে ফিরলে এয়ারপোর্টেই তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, অন্যদের জীবন বিপন্ন করে তাঁর ফেরা কতটুকু নিরাপদ?
নিজের অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়েও নতুন তথ্য দিয়েছেন হাসিনা। জানান, দলের জ্যেষ্ঠ প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমই পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। ছোটবোন শেখ রেহানা প্রসঙ্গে স্পষ্ট জানান, রেহানা সরাসরি রাজনীতির সাথে যুক্ত নন।
অর্থাৎ, ভারতীয় গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ইঙ্গিত, তাঁর অনুপস্থিতিতে দলের নেতৃত্বের চাবিকাঠি যেতে পারে শেখ সেলিমের হাতে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের বড় একটি অংশ সোচ্চার সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে। শীর্ষ পদ আর দলীয় কর্তৃত্ব নিয়ে শেখ পরিবারের অন্দরেই কি তবে তৈরি হয়েছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক কোন্দল? বিতর্ক শুরু হয়েছে তা নিয়ে।
দল ভাঙার আভাস
ইতিহাস বলছে, অতীতে অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে জাতীয় পার্টির মতো বড় দলও ভাঙন ও বিলুপ্তির মুখে পড়েছিল। শেখ পরিবারের এই দ্বিমুখী অবস্থানের পর আওয়ামী লীগও কি তবে একই অনিশ্চিত ও ভাঙনের পথে হাঁটছে?
এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় শেখ সেলিমকে সামনে আনার চেষ্টা চললেও, দেশের রাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং বিদেশ থেকে দল পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে রয়েছে বড় প্রশ্ন। ফলে, নেতৃত্ব সংকটে পড়া গণবিচ্ছিন্ন একটি দলকে, এভাবে কোনো নির্দিষ্ট মুখ সামনে এনে রক্ষা করা বা ঘুরে দাঁড় করানো প্রায় অসম্ভব।
কথার নড়চড় ও অসত্য তথ্য
অথচ, বাস্তবতা আর নিজের কথার বৈপরীত্যে নিজেই বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন শেখ হাসিনা। অতীতে ‘হাসিনা পালায় না’ হুঙ্কার দিলেও ২০২৪ সালের সোমবার (৫ আগস্ট) গণঅভ্যুত্থানের মুখে ঠিক পালিয়ে যান তিনি।
ওই সাক্ষাৎকারেই হাসিনা স্বীকার করেন, দেশ ছাড়ার মুহূর্তেও তিনি জানতেন না যে ভারতে যাচ্ছেন। ভেবেছিলেন টুঙ্গিপাড়ায় গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন, কিন্তু এয়ারক্রাফটে ওঠার পর জানতে পারেন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাঁকে।
কথার নড়চড় কিংবা অসত্য তথ্যের রাজনীতি হাসিনার জন্য নতুন নয়। অতীতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ‘কোটা থাকবে না’ বলে ঘোষণা দিলেও পরবর্তীতে তা বহাল রাখা হয়।
কিংবা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিভিন্ন মনগড়া বক্তব্যসহ নানা স্পর্শকাতর বিষয়ে অসত্য তথ্য ছড়ানোর ইতিহাস তাঁর দীর্ঘদিনের। এবার ট্রাভেল ডকুমেন্ট ও দেশে ফেরা নিয়েও তুলেছেন অদ্ভুত যুক্তি। প্রশ্ন তুলেছেন, নিজ দেশে ফিরতে আবার কিসের অনুমতি?
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের দাবি, আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যেও দেশে ফিরতে পারবেন না শেখ হাসিনা। তাদের মতে, কোনো স্বৈরাচার একবার পালালে তার আর ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।
ভারতের অবস্থান
এদিকে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার-এ অনির্বাণ দাসগুপ্তের লেখা এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের একটি উচ্চপর্যায়ের গোয়েন্দা প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে শীর্ষ কর্মকর্তাদের জানিয়ে গেছে, ভারত কোনো অবস্থাতেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করবে না।
এসব বিষয় নিয়ে, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসির বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো দায়িত্বহীন বক্তব্য ও কথার বৈপরীত্য। দলকে চাঙ্গা রাখতে কোনো পরিকল্পনা বা রোডম্যাপ ছাড়া ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলে, যখন আবার নিরাপত্তার অজুহাত তোলা হয়, তখন নেতাকর্মীদের বিভ্রান্তি আরও বাড়ে। এটি মূলত নিজেদের বিতর্কিত ও অসত্য অবস্থান আড়াল করারই একটি ব্যর্থ চেষ্টা। তিনি আরো বলেন, যেভাবে ভাবা হচ্ছে, সেভাবে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরতে হলে তাঁকে একজন আসামি হিসেবেই বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।
নিজের অবস্থান ধরে রাখতে গিয়ে বারবার নিজের বক্তব্যেরই বিপরীত দাঁড় করাচ্ছেন শেখ হাসিনা। ক্ষমতা হারানোর পর থেকে নিত্যনতুন অজুহাত আর সুর পাল্টানোর এই রাজনীতি তাঁকে আবারও মিথ্যাবাদী প্রমাণ করছে নতুন করে।
আরও পড়ুন:







