বাতাসের কণায় আজও যেন ভেসে বেড়ায় জুলাইয়ের গুলি-বারুদের গন্ধ। স্মৃতির পর্দায় বারবার ভেসে ওঠে—কত শত ঝরে যাওয়া তাজা প্রাণ। রাজপথে রক্তের সেই দাগ হয়তো সময়ের স্রোতে কিছুটা মলিন হয়েছে, কিন্তু মুছে যায়নি আজও।
২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজপথ থেকে ছাত্র-জনতার তাজা রক্তের দাগ এখনও পুরোপুরি শুকায়নি। এরই মধ্যে বিদেশের মাটিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের দ্বারা জুলাইযোদ্ধাদের টার্গেট করে একের পর এক হামলা, ‘জঙ্গি’ বলে কটাক্ষ এবং শারীরিক লাঞ্ছনা—নতুন করে যেন তৈরি করছে এক গভীর ক্ষত।
ভেনিসে বাঁধনের ওপর হামলা
সম্প্রতি ইতালির ভেনিসে ‘জুলাই জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা সেই ক্ষতকেই যেন আবারও করে তুলেছে দগদগে।
জানা যায়, ভেনিসে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় একটি পার্কে ঘুরতে বের হয়েছিলেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। সেখানেই আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরে হামলা করে।
বাঁধনের অভিযোগ, ভেনিসে থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তাকে ঘিরে ধরে পানি, কোক ও ডিম ছুড়ে মারে। এমনকি তার গায়েও আঘাত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এছাড়াও তাকে জোর করে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলানোর অভিযোগও উঠে আসে তার বক্তব্য থেকে। একই সঙ্গে তাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি ও শারীরিকভাবে হেনস্তা করা হয়।
হামলার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভে এসে এসব ঘটনার কথা তুলে ধরেন তিনি। ঘটনার বিবরণের পাশাপাশি, এসব হামলা তাকে কোনোভাবেই দমাতে পারবে না বলেও হুঁশিয়ারি দিতে দেখা যায় বাঁধনকে।
হামলাকারীদের পরিচয়
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বাঁধনের ওপর হামলাকারীদের নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে আসে একাধিক সূত্রে। স্থানীয় তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্র ধরে কয়েকজনের পরিচয়ও সামনে এসেছে।
তাদের মধ্যে একজনের নাম হাওলাদার মনিরুল। জানা যায়, মাদারীপুর সদর উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন তিনি। ধুরাইল আদর্শ বিদ্যানিকেতন থেকে এসএসসি পাস করেছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে তথ্য উঠে আসে। এমনকি লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইতালিতে অবস্থান করছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এছাড়াও হামলাকারীদের মধ্যে নূরে আলম নামের এক ছাত্রলীগ কর্মীর নামও সামনে আসে। সূত্র বলছে, হামলাকারী নূরে আলম কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুরের বাসিন্দা।
প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ
অপরদিকে, ‘জুলাই জঙ্গি’ ট্যাগ দিয়ে ইতালিতে বাঁধনের ওপর হওয়া হামলার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয় তুমুল উত্তেজনা। অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট থেকে শুরু করে জুলাইপন্থি সাংবাদিক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ জানান এই হামলার।
একই সঙ্গে ছাত্রলীগের কর্মীদের দ্বারা বাঁধনের ওপর এই হামলার ঘটনায় সংসদেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে ডেপুটি স্পিকার ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—সবার বক্তব্যেই এই হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ ও প্রতিবাদ জানাতে দেখা যায়। সেইসাথে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের মাধ্যমে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
জুলাইযোদ্ধাদের ওপর বারবার হামলা
জুলাইযোদ্ধারা দেশের বাইরে আক্রমণ ও হামলার শিকার হওয়া কোনো নতুন বিষয় নয়। বরং প্রতিনিয়তই বিভিন্ন দেশের মাটিতে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে হেনস্তা ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার শিকার হয়ে আসছেন জুলাইয়ে স্বীকৃত অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও জুলাইযোদ্ধারা।
এর আগে ইতালির রোমের তোর পিনাতারা এলাকায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাতে বনি আমিনের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল। বনি আমিনের ওপর আক্রমণের সেই ভিডিওতে কয়েকজন তাকে ধাওয়া করে রাস্তায় ফেলে শারীরিকভাবে আঘাত করার চিত্র উঠে আসে।
এছাড়াও দেশের মাটিতেই কিছুদিন আগে ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে পরিচিত শান্তা ফারজানা ও তার স্বামী মোমেন মেহেদীর হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের সদস্য সচিব ও জুলাই যোদ্ধা আ ন ম আয়াস।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে প্রেসক্লাবের সামনে ক্যান্সারজয়ী ও জুলাই অভ্যুত্থানে আহত আয়াসকে মাটিতে ফেলে সেফটি স্টিক দিয়ে পেটাতে দেখা যায় শান্তা ও তার সহযোগীদের।
যে দলের বিরুদ্ধে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে হাজারো ছাত্র-জনতার রক্ত ঝরানোর অভিযোগ, সেই দলের নেতাকর্মীরাই বিন্দুমাত্র অনুশোচনা তো দূরের কথা—উল্টো জুলাইয়ের সংশ্লিষ্টদের ওপর হামলা ও শারীরিক হেনস্থা করে যাচ্ছেন বিভিন্ন সময়ে।
এরই মধ্যে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নানা সময়ে দেশের মাটিতে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে স্বাভাবিক করার পক্ষে সুশীল সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্যও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই ও এর চেতনা রক্ষা করতে হলে সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে জুলাইযোদ্ধাদের নিরাপত্তা। তাই শুধু দেশেই নয়, বিদেশের মাটিতেও জুলাই-সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের বড় দাবি।
আরও পড়ুন:







