শনিবার

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১ আশ্বিন, ১৪৩৩

প্রধান বিচারপতির এজলাসে বাগবিতণ্ডা, বেঞ্চ ছাড়লেন বিচারপতিরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৬:৩০

শেয়ার

প্রধান বিচারপতির এজলাসে বাগবিতণ্ডা, বেঞ্চ ছাড়লেন বিচারপতিরা
ছবি সংগৃহীত

তথ্য গোপনের অভিযোগে এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার বিষয় নিয়ে শুনানিতে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতিসহ আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এজলাস ছেড়ে চলে যান। এরপর মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) আর আদালত বসেনি বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে একটি মামলার শুনানির সময় এ ঘটনা ঘটে। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা ছিলেন বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক, বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি মো. হাবিবুল গণি।

জরিমানা মওকুফের অনুরোধ নিয়ে বাগবিতণ্ডা

ঘটনার পর সাংবাদিকদের সামনে এর বর্ণনা দেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

ব্যারিস্টার খোকন জানান, এক আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তিনি প্রধান বিচারপতির কাছে ওই জরিমানা মওকুফের অনুরোধ করেন। এ সময় তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর আগের মতো মামলা শুনানি করা যাচ্ছে না এবং এ কারণে আইনজীবীদের আয় কমে গেছে। একজন জুনিয়র আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা কস্ট দেওয়া অনেক বেশি হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজলের বর্ণনা অনুযায়ী, জরিমানা মওকুফের অনুরোধের জবাবে প্রধান বিচারপতি জানান, আদালতের সঙ্গে প্রতারণা এবং গুরুতর জালিয়াতির বিষয়টি বিবেচনা করেই আদেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত ওই আদেশ পরিবর্তন করবে না বলেও তিনি জানান।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এরপর আইনজীবীদের আয় কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি ব্যারিস্টার খোকনের কাছে জানতে চান, তিনি কি বলতে চাচ্ছেন যে প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরই আইনজীবীদের আয় কমে গেছে।

ব্যারিস্টার খোকন একই বক্তব্য আবার বলার চেষ্টা করলে প্রধান বিচারপতি তার বক্তব্যকে আদালত অবমাননার শামিল বলে উল্লেখ করেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চ এজলাস ছাড়েন

অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, এরপর প্রধান বিচারপতি আর দিনের কার্যক্রমে অংশ নেবেন না বলে জানান এবং এজলাস থেকে উঠে যান। পরে প্রধান বিচারপতিসহ বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরাও এজলাস ছেড়ে যান।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ ঘটনার পর মঙ্গলবার আর আদালত বসেনি।

যে মামলার আদেশ ঘিরে ঘটনার সূত্রপাত

মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে আপিল বিভাগ একটি মামলায় আদেশ দেন। একই বিষয়ে একাধিক রিট আবেদন এবং আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগে রিট আবেদনকারী মো. নূর আলম ও তার আইনজীবী সুফিয়া আহামেদকে পাঁচ লাখ টাকা করে মোট ১০ লাখ টাকা কস্ট করা হয়। জরিমানার অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, ২০১৩ সালে অস্থায়ী কাজী নিয়োগকে কেন্দ্র করে মামলাটির সূত্রপাত।

যাত্রাবাড়ী থানার ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মিজানুর রহমান মুরাদের নিয়োগের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মো. নূর আলম ২০১৬ সালে রিট আবেদন করেন। রিট পিটিশন নম্বর ১৪৮২১। ওই আবেদনে অস্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করার আবেদন এবং স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির নিয়োগ বাতিলের আবেদন করা হয়।

ওই মামলায় নূর আলম হাইকোর্টে হেরে যাওয়ার পর বিষয়টি আপিল বিভাগে যায়। আপিল বিভাগ অস্থায়ী নিয়োগ বাতিল করে স্থায়ী নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বহাল রাখার আদেশ দেন।

একাধিক রিটে আগের মামলার তথ্য গোপনের অভিযোগ

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক জানান, এরপর ২০১৮ সালে ১৬০৮৮ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করে ২০২১ সালে ১১৪৪৬ নম্বর এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালে ৯৬৩১ নম্বর রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলার কোনোটিতেই আগের মামলার আদেশ ও আপিল বিভাগের আদেশের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি।

এর মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবের বিরুদ্ধেও আদালত অবমাননার আবেদন আনা হয় বলে জানান তিনি।

অনীক আর হক বলেন, বিষয়টি একদিনে নিষ্পত্তি হয়নি। টানা তিন দিন শুনানি হয়েছে। শুনানির সময় আপিল বিভাগের রেকর্ড ও পুরোনো ফাইল তলব করে দেখা হয়, একই বাদী ও একই আইনজীবী পরপর একাধিক রিট আবেদন করেছেন এবং আগের মামলাগুলোর তথ্য গোপন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রিট আবেদনকারী ও তার আইনজীবীকে পাঁচ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।

জরিমানার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী

অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, জরিমানা করার সময় সংশ্লিষ্ট নারী আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং কোনো উচ্চবাচ্য না করে আদালতের আদেশ মেনে নেন। প্রায় তিন ঘণ্টা পর ব্যারিস্টার খোকন বিষয়টি নিয়ে আদালতে কথা বলেন। তখন ওই নারী আইনজীবী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

অনীক আর হক বলেন, তার মনে হয় না যে ওই নারী আইনজীবী কোনো কিছু করেছেন। তার দাবি, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে বিষয়টি আদালতে তুলেছেন। এসব মামলায় ফাইলিং আইনজীবীর সিনিয়র হিসেবে ব্যারিস্টার খোকন যুক্ত ছিলেন বলেও জানান তিনি।