রাজনীতির মঞ্চে পর্দা নামলেও, নাটক থামল কই? তবে কি কূলহারা নৌকার হাল ধরেছে সজীব ওয়াজেদ জয়? দেশে যখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত, ভরাডুবি নৌকার নেতাকর্মীদের বড় অংশ যখন দিশেহারা, তখন বিদেশের মাটিতে হঠাৎ করেই নতুন রূপে হাজির হয়েছেন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। ইতালির ভেনিস থেকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা।
জয়কে ঘিরে নতুন বন্দনা
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে তৃণমূলের স্থানীয় কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টে দেখা যাচ্ছে এখন জয় বন্দনার নতুন পর্ব। কারও চোখে তিনি আগামীর কাণ্ডারি, কারও কাছে যেন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী। আবার কারও মুখে তাকে নিয়ে ফুটে উঠছে প্রশংসার ফুলঝুরি।
শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকের একটি পোস্টেও উঠে আসে জয় বন্দনার ফুলঝুড়ি। শেখ হাসিনা ও তার পুত্র জয় বর্তমান সরকারের জন্য একটি আতঙ্কের নাম বলেও উল্লেখ করা হয় পোস্টে।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—যাকে কূলহারা নৌকার কাণ্ডারি হিসেবে প্রশংসার জোয়ারে ভাসানো হচ্ছে, সে কি আসলেই কাণ্ডারীর দায়িত্ব নেয়ার যোগ্যতা রাখে, নাকি ডুবন্ত নৌকায় নতুন করে বৈঠা ধরার গল্পটাও কেবল রাজনৈতিক কল্পকথা?
দেশে যখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি চরম সংকটের মুখে, তখন জয়কে ঘিরে এমন উচ্ছ্বাসকে অনেকেই দেখছেন রাজনৈতিক বাস্তবতার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্পনার প্রতিফলন হিসেবে।
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিনাকী ভট্টাচার্যের একটি পোস্টেও উঠে আসে বিষয়টি। দেশে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের এই দুর্দশার মধ্যেও বিদেশের মাটিতে হাসিনা-পুত্র জয়ের বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে তীব্র সমালোচনা করা হয় পোস্টে।
অর্থপাচার ও দুর্নীতির অভিযোগ
অন্যদিকে, জয়ের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থপাচারের নানা অভিযোগের তথ্যও উঠে এসেছে নানা সময়ে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন—এফবিআইয়ের তদন্তে সামনে এসেছে এমনই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। যেখানে শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্র ও কেম্যান আইল্যান্ডে ৩০ কোটি ডলার বা ৬০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে দাবি করা হয় এফবিআইয়ের প্রতিবেদনে।
এ ছাড়াও আইসিটি ও টেলিকম খাতেও উঠে এসেছে জয়ের দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। এমনকি হাসিনা-পুত্রের বিরুদ্ধে টেলিকম খাতে সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড থেকে হাজার কোটি টাকা লোটপাটের বিষয়ও উঠে এসেছে টাস্কফোর্সের তথ্যে।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের কাজ না করে ৫১৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে জয়ের বিরুদ্ধে। সাবেক তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এসব কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে। সেই সঙ্গে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ইন্টারনেট বন্ধ করে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগেও উঠে এসেছে জয়ের নাম।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সমালোচনা
অন্যদিকে সমালোচনা রয়েছে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের ব্যক্তিজীবন নিয়েও। সজীব ওয়াজেদ জয় ২০০২ সালে ক্রিস্টিন অ্যান ওভারমায়ার নামের এক খ্রিষ্টান তরুণীকে বিয়ে করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হলে সংসদে খ্রিষ্টানদের মুসলমানদের ‘আহলে কিতাব’ হিসেবে উল্লেখ করে ছেলের খ্রিষ্টান তরুণীকে বিয়ে করার বিষয়টি ইসলাম নিয়ে, নিজের মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে হালকা করার অপচেষ্টা করেছেন হাসিনা—এমন সমালোচনাও রয়েছে।
২০০২ সালের ২৬ অক্টোবর মার্কিন নাগরিক ক্রিস্টিন ওভারমায়ারের সঙ্গে জয়ের বিয়ে হলেও সেই বৈবাহিক সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি বলে জানা যায়। আরও জানা যায়, ২০১১ সালে এসে দীর্ঘ ৯ বছরের সেই সংসারের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ ঘটে জয়ের। বর্তমানেও, আরেক বিদেশী খ্রিষ্টান নারীকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন জয়, রয়েছে এমন গুঞ্জন।
অপরদিকে, দেশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ক্লান্তিলগ্নে, নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে রেখে বিদেশের মাটিতে হাসিনা-পুত্র জয়ের প্রায় নগ্ন চলাফেরা এবং নারীদের নিয়ে ঘোরাফেরার কারণে তার আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জয়ের নেতৃত্ব নিয়ে বিদ্রুপ করেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য।
নেতৃত্বের প্রশ্ন
সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জয় বন্দনার মাঝেই সামনে এসেছে শেখ হাসিনার অবাক করা একটি সাক্ষাৎকার। সম্প্রতি ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়ালকে দেয়া পলাতক শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, তাঁর অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
দ্য ওয়ালকে দেয়া শেখ হাসিনার এই সাক্ষাৎকার এবং সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিতর্কিত অধ্যায়কে সামনে রাখলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা জয়ের নেই বলেই মনে করছে বিশ্লেষকরা।
সব মিলিয়ে, রাজনীতির মাঠে যার সক্রিয় উপস্থিতি নেই এবং যার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হওয়ার আগেই একাধিক বিতর্কে জর্জরিত, তাকেই যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বানিয়ে দেয়া হচ্ছে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি, তখন সেই কাণ্ডারিই পরিণত হয়েছে বিদ্রুপের পাত্রে।
আরও পড়ুন:



.jpg)



