মঙ্গলবার

৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩ ভাদ্র, ১৪৩৩

অটোরিকশায় বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৮:৫৩

শেয়ার

অটোরিকশায় বছরে ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি সংগৃহীত

দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সড়ক নিরাপত্তা, যানজট, পরিবেশ ও সরকারি রাজস্বে চাপ বাড়ছে। দেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যানবাহনের বিদ্যুৎ চাহিদা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। পাশাপাশি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ায় বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ৭১ বিধিতে দেওয়া জরুরি জন-গুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের জবাবে তিনি এসব তথ্য জানান। ‘নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা চলাচল প্রসঙ্গে’ নোটিশটি দেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৪-এর সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু।

অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে। এসব যানবাহনের দৈনন্দিন বিদ্যুৎ চাহিদা দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি।

সরকারের ধারণা অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে। এসব পয়েন্টে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে জাতীয় গ্রিড ও স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনুমোদিত বা আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগের বাণিজ্যিক ব্যবহার, ট্রান্সফর্মার ও বিতরণ লাইনে অতিরিক্ত লোড এবং পিক সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

ঢাকায় প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে ৩০০ অটোরিকশা

নোটিশের ওপর বক্তব্য দিতে গিয়ে রেহানা আক্তার রানু বলেন, বর্তমানে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচলের পাশাপাশি ঢাকায় প্রতিদিন আরও প্রায় ৩০০টি অটোরিকশা যুক্ত হচ্ছে। তার দাবি, প্রতিদিন অটোরিকশার চার্জিংয়ে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে, যা লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ।

তিনি বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে চার্জিং করায় বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।

তবে অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত উল্লেখ করে তিনি বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া এসব যানবাহন জব্দ, ডাম্পিং বা চালকদের হয়রানি না করার আহ্বান জানান।

এআই ক্যামেরায় শনাক্ত হলেও জরিমানা করা যাচ্ছে না

রেহানা আক্তার রানু বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে এআইভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর লালবাতি অমান্য, লেন পরিবর্তন ও নির্ধারিত গতিসীমা লঙ্ঘনের মতো অনিয়ম কমেছে। তবে নাম্বার প্লেট না থাকায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে ক্যামেরায় শনাক্ত করা গেলেও জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছে না।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে বর্তমানে ৫০টি এআই ক্যামেরা চালু রয়েছে। এসব ক্যামেরা যানবাহনের নাম্বার প্লেট শনাক্ত করে কেন্দ্রীয় সার্ভারে তথ্য পাঠায় এবং পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা করা হয়।

রেহানা আক্তার রানু অটোরিকশায় নাম্বার প্লেট সংযোজন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের আওতায় আনা এবং প্রধান সড়ক থেকে এসব যান সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন।

সড়ক দুর্ঘটনায় অটোরিকশার অংশ ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল যানজটের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় যুক্ত যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

অনিবন্ধিত যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, ব্রেক ও আলো ব্যবস্থার ত্রুটি, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়কে স্বল্পগতির যান চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।

লেড-অ্যাসিড ব্যাটারিতে পরিবেশঝুঁকি

অটোরিকশায় ব্যবহৃত লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারি রিসাইক্লিংয়ের কারণে শিষাদূষণ, মাটি ও পানি দূষণ হচ্ছে। এতে বিশেষ করে শিশু শ্রমিকদের গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। কৃষি ও পোলট্রি শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এ কারণে নতুন নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আরও ২০০ এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে চালু থাকা ৫০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরার মাধ্যমে অটোরিকশাসহ অন্যান্য যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।

এর ধারাবাহিকতায় রমনা ও তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগে আরও ২০০টি এআইভিত্তিক ক্যামেরা স্থাপনের কার্যক্রম চলছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়েও এসব ক্যামেরা স্থাপন করা হবে।

নিবন্ধন, রুট ও চালক নিয়ন্ত্রণে আসছে

অটোরিকশাকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে সরকার নীতিমালা প্রণয়নের কাজ করছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে অনুমোদিত অটোরিকশাকে নাম্বার প্লেট ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে। চালকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্সের আওতায় আনা হবে। নির্ধারণ করা হবে চলাচলের সড়ক। যানবাহনের সংখ্যা, রুট, চালক ও চলাচল ব্যবস্থাপনাও নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে যাতে একাধিক অটোরিকশা চালানো না যায়, সে ব্যবস্থাও করা হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যাটারি ও যানবাহন ট্র্যাক করার ব্যবস্থার কথাও জানান তিনি।

বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া জব্দ বা হয়রানি নয়

নোটিশের জবাবের পর রেহানা আক্তার রানু বলেন, তিনি অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ করার কথা বলেননি; বরং চলাচল নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, অটোরিকশার সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাই বিকল্প ব্যবস্থা না করে বাহন জব্দ, ডাম্পিং বা পুলিশি হয়রানি করা ঠিক হবে না। প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সড়কে এসব যান চলাচলের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

সরকারের নীতিমালা কবে নাগাদ হবে, সে বিষয়েও তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জানতে চান।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে এবং নীতিমালা ও বিধি প্রণয়নের অগ্রগতি হয়েছে। কর্মসংস্থান যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, পরিবেশ রক্ষা হয় এবং যানবাহনের শৃঙ্খলা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়, সব দিক বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালা বাস্তবায়ন করা হবে।

সরকারের লক্ষ্য বেকারত্ব না বাড়িয়ে কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ রক্ষা এবং যানবাহনের সুশৃঙ্খল চলাচল নিশ্চিত করা বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।