শনিবার

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১ আশ্বিন, ১৪৩৩

নতুন মাদক ঝাক্কি’র ফাঁদে তরুণরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:০৩

শেয়ার

নতুন মাদক ঝাক্কি’র ফাঁদে তরুণরা
ছবি সংগৃহীত

রাজধানীর ডেমরা ও আশপাশের এলাকায় ঠান্ডা-কাশির সিরাপের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তৈরি ‘ঝাক্কি’ নামের মাদকের ব্যবহার বাড়ছে। কম খরচে তৈরি করা যায় বলে মাদকসেবীদের একটি অংশ ফেনসিডিল, ইয়াবার মতো তুলনামূলক ব্যয়বহুল মাদকের বিকল্প হিসেবে ঝাক্কির দিকে ঝুঁকছেন। এতে তরুণদের পাশাপাশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে।

মাদকসেবীদের ভাষ্য, ৫০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ঝাক্কি তৈরি করা যায়। তবে ব্যবহৃত সিরাপ ও ঘুমের ওষুধের ধরন অনুযায়ী খরচ ২৫ টাকা থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে নিষিদ্ধ স্কাফ সিরাপের সঙ্গেও ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে এটি তৈরি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

কম খরচে নেশার বিকল্প

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঝাক্কিসেবী জানান, ইয়াবা, গাঁজা ও মদের তুলনায় ঝাক্কির নেশা তাদের কাছে বেশি পছন্দের। ফেনসিডিলের দাম এলাকাভেদে সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা হওয়ায় অনেকেই অতিরিক্ত খরচ বহন করতে না পেরে ঝাক্কির দিকে ঝুঁকছেন।

তাদের দাবি, ফেনসিডিল ও ইয়াবা সেবনে বেশি টাকা লাগে। তাই প্রতিদিন একটি ঝাক্কি খেলেই চলে। কখনো কখনো দুই থেকে তিনটিও নিতে হয়। স্কুল-কলেজের ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও ঝাক্কি সেবন করছে বলে তারা দাবি করেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইয়াবা সেবন ব্যয়বহুল ও ক্ষতিকর এবং ফেনসিডিলের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঝাক্কির ব্যবহার বাড়ছে। ডেক্সপোটেন, ওকফ, সুডুকফ, তুসকা, ফেনারগ্যান, ডায়ড্রিল, মিরাকফ ও এমব্রক্সসহ বিভিন্ন ঠান্ডা-কাশির সিরাপ ৮৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। ফেনারগ্যান, এমব্রক্স ও ডায়ড্রিল পাওয়া যাচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকায়।

এ ছাড়া ইউনানি বাশক, এসবি বাশক ও এডোবাস সিরাপের সঙ্গেও ঘুমের ওষুধ মেশানো হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে মাদক

নকটিন-১০, সেডিল, টিপটিন, ইজিয়াম ও এমিলিনসহ বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ ১০ টাকা পাতায় এবং ১০০ টাকা বক্স হিসেবে কিনে সিরাপের সঙ্গে মেশানো হয় বলে জানা গেছে। কিছুটা বেশি দামের রিবোটিল, ডিসোপেন ও লোনাপামও ঝাক্কি তৈরিতে ব্যবহার করছেন মাদকসেবীরা।

ফেনসিডিলের সহজলভ্যতা কমলেও ডেমরায় ইয়াবা, মদ ও গাঁজা সহজেই পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরবর্তী এবং নিরিবিলি এলাকাগুলোতে মাদকের ব্যাপকতা বেশি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

থানা পুলিশ অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সুযোগে মাদক ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ বিক্রির অভিযোগ

সরেজমিনে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, ডেমরা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা ও মদ বিক্রি হচ্ছে। বাঁশেরপুল এলাকার একটি বারে সহজলভ্য হয়েছে মদ। পার্সেল হিসেবেও এসব মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডেমরার বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য ছোট-বড় ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ঠান্ডা-কাশির সিরাপ ও ঘুমের ওষুধ বিক্রি করছেন।

আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ঠান্ডা-কাশি ও জ্বর বাড়ায় নেশার জন্য ওষুধ কিনতে আসা ব্যক্তিদের সাধারণ ক্রেতাদের থেকে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য চিকিৎসকের দেওয়া ঘুমের ওষুধের প্রেসক্রিপশন সংগ্রহ করে মাদকসেবীরা সিরাপের সঙ্গে এসব ওষুধ কিনছেন বলেও জানা গেছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক

সারুলিয়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক শামীম মিছির বলেন, ঘুমের ওষুধ ঠান্ডা-কাশির সিরাপের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে অতিরিক্ত তন্দ্রা, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি কমে যাওয়া, বিভ্রান্তি, ভারসাম্যহীনতা, অজ্ঞান হওয়া এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

রাজাখালী এলাকার অভিভাবক মিজানুর রহমান বলেন, থানা পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকলেও ঝাক্কির দৌরাত্ম্য বন্ধে তেমন পদক্ষেপ নেই। এতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পুলিশের

ডেমরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ তাইফুর রহমান মির্জা বলেন, ইয়াবা-ফেনসিডিলের কথা শুনেছেন, তবে ঠান্ডা-কাশির সিরাপের সঙ্গে ঘুমের বড়ি মিশিয়ে নেশা করার বিষয়টি তিনি এখনই জেনেছেন।

তিনি বলেন, মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং ওয়ার্ডভিত্তিক মাদক ও সন্ত্রাসবিরোধী কমিটি গঠন করতে হবে।