ভালোবাসার নামে প্রেম, প্রেমের সঙ্গে যৌনাচার; রাস্তাঘাটে পরকীয়া, পাবলিক প্লেসে ব্যভিচার, নির্জন স্থানে অনৈতিক সম্পর্ক, আবার কখনো শহরের আবাসিক হোটেলে তরুণ-তরুণীদের আপত্তিকর ভিডিও। দেশের নানা প্রান্তে আজ যেন একই চিত্রের বিস্তার।
কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়—এসব কি নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা? নাকি এর আড়ালে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে সমাজের আসল চিত্র—আরও গভীর কোনো সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি?
প্রেমের নামে পরকীয়া ও ধর্মান্তরের ঘটনা
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এমন একাধিক ঘটনার ভিডিও সামনে এসেছে, যেখানে বিবাহিত মুসলিম নারীর সঙ্গে হিন্দু যুবকের পরকীয়া সম্পর্কের ঘটনা উঠে আসে।
শুধু তাই নয়, গাজীপুরের তাসমিয়া তাবাস্সুম নামের এক মুসলিম কিশোরী অপ্রাপ্তবয়স্ক শুভ নামের এক হিন্দু ছেলের প্রেমের ফাঁদে পড়ে তাকে বিয়ে করার জন্য নিজ ধর্ম ইসলাম ত্যাগ করার ঘোষণাও দিতে দেখা যায় একটি ভিডিওতে। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
এছাড়াও, ওই কিশোরী তাসমিয়া তাবাস্সুমের মা হিন্দু ওই যুবকের বিরুদ্ধে জোর করে মেয়েকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করলে, ফেসবুক লাইভে এসে তার মায়ের এসব অভিযোগকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিতে দেখা যায় তাসমিয়াকে।
যদিও, পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিওতে তাসমিয়াকে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুশোচনা করতেও দেখা যায়।
ব্ল্যাকমেইল ও ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপের অভিযোগ
সেই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণীদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে গোপনে ভিডিও ধারণের পর তা ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে কিছু কট্টোর হিন্দুত্ববাদী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এমনকি এ নিয়ে সেই মুসলিম তরুণীদের দিনের পর দিন শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করার অভিযোগও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগের সূত্র ধরেই ‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’-এর নামে মুসলিম তরুণীদের সম্ভ্রমহানির কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও ভিডিওও বিভিন্ন সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
শুধু অবিবাহিত তরুণীরাই নন—অভিযোগের তালিকায় এবার উঠে আসছেন বিবাহিত নারীরাও। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে হিন্দু এক যুবকের অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগকে ঘিরে এলাকায় তৈরি হয়েছে চাঞ্চল্য। অভিযোগ রয়েছে, উগ্র হিন্দুত্ববাদী কিছু ব্যক্তির সম্পর্কের ফাঁদ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বিবাহিত নারীরাও।
আর এমন অভিযোগের মধ্যেই এবার সিলেটের মোগলাবাজারের হাজীগঞ্জ এলাকায় সামনে এসেছে অপু দাস নামের এক হিন্দু ব্যক্তিকে ঘিরে একটি ভিডিও, যাতে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। একাধিক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক ও প্রতারণার অভিযোগে তাকে আটক করে স্থানীয় জনতা। এসময়, অভিযুক্তের মোবাইল ফোনে একাধিক মুসলিম নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের তথ্য পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন প্রবাসীর স্ত্রীও রয়েছেন বলে জানা যায়। এমনকি এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত অপু দাসের স্বীকারোক্তিও পাওয়া যায় ওই ভিডিওতে।
রাস্তাঘাট হোটেল ও পাবলিক স্পেসে অশ্লীলতা
তবে শুধু কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ঘিরে ওঠা অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগই নয়—শহরের রাস্তাঘাট, পার্ক কিংবা নির্জন স্থান থেকে শুরু করে আবাসিক হোটেল—বিভিন্ন জায়গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা ভিডিওতে উঠে এসেছে আরও বিস্তৃত এক সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্র।
সমালোচনা রয়েছে, অবক্ষয়ের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে বারবার সামনে আসে রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলো। যেখানে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উঠে এসেছে সমাজের এক চরম অন্ধকার বাস্তবতা—অবৈধ সম্পর্ক, অনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং গোপনে ধারণ করা আপত্তিকর দৃশ্য।
অন্যদিকে, প্রবাসীর স্ত্রীদের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ার পর বিয়ে পড়িয়ে দেয়ার চিত্রও সামনে আসছে নানাভাবে।
সেই সঙ্গে নির্জন স্থানে, গহীন জঙ্গলের বাঁশঝাড়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবস্থায়, জনতার হাতে ধরা পড়ার পর এক মেয়েকে পতিতাবৃত্তিকে স্বাভাবিক হিসেবে তুলে ধরে সরল স্বীকারোক্তি দেয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে একটি ভিডিওতে।
শিক্ষক ছাত্রী সম্পর্ক ও ভয়াবহ পরিণতি
ধরে নেয়া হয়, পৃথিবীতে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্কগুলোর একটি। জ্ঞান, নৈতিকতা আর আদর্শের আলোয় যে সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা—সেই পবিত্র সম্পর্কের মাঝেও কখনো কখনো লেগে যায় কলঙ্কের কালিমা।
তেমনই, সম্প্রতি শিক্ষক ও ছাত্রীর একটি গোপন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। আর সেই বিতর্কের মাঝেই ওই ছাত্রী লাইভে এসে উন্মোচন করেন শিক্ষকের ঘৃণ্য আরেক রূপ।
অনৈতিক সম্পর্ক হোক কিংবা পরকীয়া—তার পরিণতি সবসময় যে ভালো হয়, এমন নয়। কখনো কখনো এর শেষ পরিণতি হয় আরও ভয়াবহ, আরও নির্মম—এমনকি প্রাণহানিও ঘটছে হরহামেশাই।
এমনই একটি ভিডিও সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ে দেশব্যাপী। যেখানে স্ত্রীর পরকীয়ার খবর স্বামী জানতে পারার পর স্ত্রীকে হত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার দৃশ্য সামনে আসে। আর সেখানেই, প্রাণ হারানোর আগে স্বামীর সামনে আকুতি করতেও দেখা যায় স্ত্রীকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস— একটি ভুলে নিভে যায় একটি প্রাণ।
এছাড়াও, ঢাকার মেট্রোরেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক স্পেসও যেন রক্ষা পাচ্ছে না এই অশালীনতা থেকে। কিছুদিন আগে জনসম্মুখে মেট্রোরেলে এক তরুণ-তরুণীর খোলামেলা চুম্বনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে, সামাজিক শালীনতা ও জনসমক্ষে ব্যক্তিগত আচরণের সীমারেখা নিয়ে।
চারদিকে যেন অশ্লীলতা আর অশালীনতার ছায়া। প্রেম-ভালোবাসার মতো অনুভূতির আড়ালে কখনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন তরুণ-তরুণীরা। আবার সেই সম্পর্কের সূত্র ধরে তৈরি হচ্ছে প্রতারণা, ব্ল্যাকমেইল, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক বিতর্ক—কখনো বা ভয়াবহ পরিণতি।
কিন্তু কেন বাড়ছে এমন প্রবণতা? এর পেছনে কি কেবল ব্যক্তিগত মূল্যবোধের অবক্ষয়, নাকি পরিবার, সামাজিক কাঠামো, প্রযুক্তির অবাধ ব্যবহার এবং নৈতিক শিক্ষার ঘাটতিও দায়ী? এই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ কী এবং তা থেকে পরিত্রাণের উপায়-ইবা কী, তা তুলে ধরেছে ধর্মীয় বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক এই অবক্ষয় নিরসনে রাষ্ট্রকে যেমন কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে, তেমনই আরও সচেতন হতে হবে অভিভাবকদেরও। কারণ, অভিভাবকদের সচেতনতা ও সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে।
আরও পড়ুন:







