সম্প্রতি, নিজের ফেসবুক আইডি থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল আসার দাবি করে, শিক্ষার্থী সিফাত আব্দুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে উদ্দেশ্য করে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় একটি ভিডিও প্রকাশ করেন।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হলে তাকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। এই গ্রেপ্তারের পর, অনেকেই রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন।
ইলিয়াস হোসাইনের পোস্টে আওয়ামী পরিচয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
২০২২ সালের অক্টোবরে সিফাত আব্দুল্লাহর দেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ও স্মৃতিচারণা সংবলিত একটি পোস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রেখে, গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী একটি পক্ষ এখন হঠাৎ করেই গ্যাস ও বিদ্যুতের দাবিতে ষড়যন্ত্র করছে, এমন অভিযোগ তুলে নিজের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন।
ওই পোস্টে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, অতীতে স্বৈরাচারী সরকারের তোষামোদ করে যারা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে, বর্তমান সংকটে তাদের আন্দোলনের কোনো নৈতিক অধিকার নেই। পোস্টে তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কটূক্তি করার কারণে কাউকে যেন কারাবন্দি করা না হয়, সে বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে একমত। তবে, একইসঙ্গে ষড়যন্ত্রকারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সাধারণ মানুষের মতো অধিকার ভোগ করার সুযোগ দিয়ে, অরাজকতা তৈরির পক্ষে নন তিনি।
পল্লী বিদ্যুতের তদন্তে ভিন্ন চিত্র
অন্যদিকে, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সিফাত আব্দুল্লাহর অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তদন্তে নামে গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১। বোর্ড বাজার জোনাল অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. আহসান কবীর স্বাক্ষরিত তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র।
তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত সিফাত আব্দুল্লাহর পিতা মো. সেকান্দার আলী। গাজীপুর মহানগরীর ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে তাদের দোতলা বিশিষ্ট বাড়িতে মোট ৩টি আবাসিক বিদ্যুৎ মিটার সংযোগ রয়েছে। সিফাত তার ভিডিওতে দাবি করেছিলেন, তিনি গত আগস্ট ও জুলাই মাসে, প্রায় ১০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করেছেন এবং বিষয়টিকে অগ্রহণযোগ্য বলে অকথ্য ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এমনকি তিনি ফেসবুক পোস্টে লেখেন ‘এক মাসের বিদ্যুৎ বিল একটা পুরো পরিবারকে জিম্মি করে ফেলবে, কিন্তু পল্লী বিদ্যুতের তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে থেকে আগস্ট এই চার মাসে সিফাতদের বাড়ির তিনটি আবাসিক মিটারের বিদ্যুৎ ব্যবহার ও বিলের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। গাজীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর হিসেব অনুযায়ী, প্রথম মিটারে, গত চার মাসে মোট ৩২০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে, যার মোট বিল এসেছে ২ হাজার ৩৫৪ টাকা।
সেইসাথে, দ্বিতীয় মিটারে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে ১ হাজার ১৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়েছে, যার মোট বিল এসেছে ৯ হাজার ৩৮৭ টাকা। আর তৃতীয় মিটারে, এই চার মাসে মোট ৬২৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারে বিল হয়েছে, ৪ হাজার ৫৩২ টাকা।
এই হিসেবে, মে থেকে আগস্ট এই চার মাসে তিনটি আবাসিক মিটার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৮০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে। আর এতে মোট বিল এসেছে ১৬ হাজার ২৭৩ টাকা। অর্থাৎ, সিফাত আব্দুল্লাহ একটি নির্দিষ্ট মিটারের বেশি বিলের কথা প্রচার করে পুরো বাড়ির তিন মিটারের সম্মিলিত হিসাব ও প্রকৃত তথ্য আড়াল করার চেষ্টা করেছেন।
এর বাইরেও শিল্প চর্চার আড়ালে বা বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের নামে সিফাত আব্দুল্লাহর বিভিন্ন আচরণ ও কর্মকাণ্ড ঘিরে, সামাজিকভাবে অতীতেও নানা ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, যা সচেতন মহলে নেতিবাচক আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিগত সময়ের চেয়ে দেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অনেক বেড়েছে; তবে স্বাধীনতার নামে কাউকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা বা বিভ্রান্তি ছড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ তুলে, অশ্রাব্য ভাষায় প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে গালাগালি করলেও, একটা শ্রেণীর সহমর্মিতা পেয়েছেন সিফাত। তবে, তার আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা এবং বিল নিয়ে সত্য আড়ালের ষড়যন্ত্র সামনে আসার পর, পরিস্থিতি পাল্টে গেছে।
আরও পড়ুন:







