শনিবার

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১ ভাদ্র, ১৪৩৩

যুদ্ধের ধাক্কায় অর্ধেকে নেমেছে বাংলাদেশের কর্মী রপ্তানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪৭

শেয়ার

যুদ্ধের ধাক্কায় অর্ধেকে নেমেছে বাংলাদেশের কর্মী রপ্তানি
ছবি সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি কমেছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৯ জন কর্মী বিদেশে গেলেও চলতি বছরের একই সময়ে গেছেন ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯৫৪ জন।

সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের কাতার ও কুয়েতেও কর্মী রপ্তানি কমেছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেড়েছে।

সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি পতন

গত ছয় মাসে সৌদি আরবে গেছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৮৫ জন কর্মী। ২০২৫ সালের একই সময়ে দেশটিতে পাঠানো হয়েছিল ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ জন। ফলে এক বছরে সৌদি আরবে কর্মী পাঠানো কমেছে প্রায় ৫৭ শতাংশ।

কাতারে গত বছর ৫৬ হাজার ৯৬ জন কর্মী গেলেও চলতি বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪ হাজার ৪০৩ জনে। কুয়েতে ২৭ হাজার ৮৬ জন থেকে কমে হয়েছে ১৩ হাজার ৭৪৫ জন।

অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গত বছর ৬ হাজার ৭৮৯ জন কর্মী গেলেও চলতি বছরে গেছেন ১৪ হাজার ৮৭৫ জন।

যুদ্ধের প্রভাবে কমেছে শ্রমিকের চাহিদা

অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। গাজা ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সংকটে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল, জ্বালানি তেল ও জাহাজ চলাচলের ব্যয় বেড়েছে।

এর ফলে নতুন অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া অনেক দেশ বিভিন্ন কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সংকুচিত করেছে। এতে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নতুন কর্মীর চাহিদাও কমেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ কমেছে। একই সঙ্গে বিমান ভাড়া ও অন-অ্যারাইভাল প্রশাসনিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ব্যয়ও বেড়েছে। ইউরোপের শ্রমবাজারেও সীমান্ত নিরাপত্তায় কড়াকড়ি ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সংকট তৈরি হয়েছে।

বিকল্প শ্রমবাজারের তাগিদ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মী রপ্তানির ধস সামাল দিতে বাংলাদেশকে একক বাজারকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, পূর্ব ইউরোপ ও আফ্রিকার উদীয়মান শ্রমবাজারে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তারা।

একই সঙ্গে অদক্ষ শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কারিগরি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তারা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক এবং সবচেয়ে বড় নির্ভরতা সৌদি আরবের ওপর। শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ঝুঁকি কমানো ও বিকল্প বাজার তৈরিতে কাঠামোগত উদ্যোগ যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেখানে থাকা শ্রমিকদের কাজের নিরাপত্তা ও নিয়মিত বেতন পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় চুক্তি কাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে সরকারের আশা

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ও অস্থিরতার পর পশ্চিম এশিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ শুরু হলে শ্রমিকের চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করছে সরকার।

বৃহস্পতিবার সংসদে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর জানান, নতুন শ্রমবাজার খোঁজা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশে যাওয়ার সুযোগ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফর করেছেন। এরপর গত জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ও মন্ত্রী দেশটি সফর করেন। এর ফলে শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ আরও সহজ হবে বলে আশা করছে সরকার।

রেমিট্যান্সে বড় ধাক্কার আশঙ্কা

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্র ইস্যু করেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।