র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। দেশের ইতিহাসে এক পৈশাচিক বাহিনী হিসেবে বদনাম রয়েছে। সমালোচকদের মতে, অপরাধ দমনের আড়ালে যে বাহিনী ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল হাসিনার এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী হিসেবে।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিবাদী শাসনের ১৭ বছরে রাজনৈতিক বিরোধী মতকে স্তব্ধ করা, প্রতিপক্ষের কণ্ঠ চিরতরে রুদ্ধ করা, অসংখ্য রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও আলেম-উলামাকে ভয় দেখিয়ে নিশ্চিহ্ন করার অভিযানে বাহিনীটিকে ব্যবহার করা হয়েছে এক রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে।
র্যাব গঠনের ইতিহাস
২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠা করা হয় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যে গঠিত এই বিশেষায়িত বাহিনীকে শুরু থেকেই সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলসের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়।
একসময় অপরাধ দমনের নামে যে বাহিনীকে দেয়া হয়েছিল বিশেষ ক্ষমতা, সময়ের স্রোতে সেই বাহিনীর নামই জড়িয়ে পড়ে গুম, ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা আর অমানবিক নির্যাতনের মতো গুরুতর সব অভিযোগে।
গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ
গুম সংক্রান্ত কমিশন ও ইনকোয়ারির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, ২৫ শতাংশ গুমের অভিযোগে র্যাবের নাম রয়েছে। এমনকি ফ্যাসিবাদের আমলে সাধারণ মানুষকে গুম-খুনের প্রধান নেপথ্যে ছিলো র্যাব—এমন তথ্যও সামনে এসেছে বিভিন্ন সময়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিরোধী দলের সদস্য বা প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদ কিংবা সরকারের ক্ষমতার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়—এমন লোকদের রাতের আঁধারে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যেত র্যাবের সদস্যরা।
আবার, রাতের আঁধারেই তাদের নিস্তব্ধ করে দেয়া হতো আয়নাঘরখ্যাত র্যাবের সেই বন্দিশালায়। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে গুম থাকাদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। নখ তুলে, নখে সুই ঢুকিয়ে, ইলেকট্রিক শক দিয়ে, ঘূর্ণায়মান চেয়ারে নির্যাতনসহ নিত্যনতুন কৌশলে ভুক্তভোগীদের ওপর চালানো হতো জুলুমের স্টিমরোলার। এমনকি না খেতে দিয়ে রাখা হতো দিনের পর দিন। দীর্ঘ সময় পর খাবার খেতে দিলেও দেয়া হতো পচা খাবার। এমন নানা অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগও সামনে এসেছে র্যাবের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও মিথ্যা জঙ্গি নাটক সাজিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের নেতৃবৃন্দকে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করার অভিযোগও রয়েছে তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। এবং তাদেরকে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দেয়ার জন্য ক্রসফায়ারের মতো ভয়ও দেখানো হতো বলেও অভিযোগ উঠে এসেছে নানা সময়ে।
ইলিয়াস আলী ও জিয়াউল আহসান
এমনকি বহুল আলোচিত বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজের ঘটনাতেও র্যাবের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নাম উঠেছে এসেছে। ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া এক সাক্ষ্যেও ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের ভূমিকার অভিযোগ তোলা হয়।
জানা যায়, এই জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বেই বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করে পেট কেটে বস্তা বেঁধে ধলেশ্বরী নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বাধীন এক র্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে এক দিনে ১৩ খুনের অভিযোগের বিষয়টিও খুঁজে পায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
আলেপ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
শুধু গুম-খুন নয়, তখনকার র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। এমনই গুরুতর অভিযোগে আলোচনায় আসে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা আলেপ উদ্দিনের নাম। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, আটক স্বামীকে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে তার স্ত্রীকে রমজান মাসে ডেকে নিয়ে রোজা ভাঙিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেছিলেন আলেপ উদ্দিন।
এসআরবি গঠনের উদ্যোগ
এসব বিতর্ক আর অভিযোগের দীর্ঘ ছায়ার মধ্যেই এবার র্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যা ইতোমধ্যে দেশজুড়ে সৃষ্টি করেছে নানা আলোচনা-সমালোচনার। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’বা এসআরবি বিল, ২০২৬। প্রস্তাব অনুযায়ী, র্যাবের জনবল, সম্পদ ও দায়িত্ব নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর হবে।
তবে, এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দকে। জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান র্যাব বিলুপ্তির প্রস্তাব সমর্থন করেন। কিন্তু নতুন একটি সংস্থা গঠনের বিষয়ে আরও চিন্তাভাবনা করে সবার সম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন বলে মত তার।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিনের দাবি, এসআরবির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বিলে। এবং এ বিষয়ে তিনি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিলটি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বানও জানান।
তবে, প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। র্যাবের জনবল ও সম্পদের বড় অংশই যদি নতুন বাহিনীতে যায়, তাহলে নাম বদলালেই কি বদলাবে সেই পুরোনো সংস্কৃতি? বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রশ্ন উঠেছে—এসআরবি কি শেষ পর্যন্ত নতুন মোড়কে র্যাবেই পরিণত হবে? উত্তরটা আপাতত তোলা রয়েছে সময়ের হাতেই।
আরও পড়ুন:







