জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথ থেকে ক্ষমতার পালাবদল-তারপর নির্বাচন, নতুন সরকার আর বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক সমীকরণ। বাংলাদেশ যেন এখন দাঁড়িয়ে আছে এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন নয়; নতুন করে নির্ধারিত হচ্ছে দেশের কূটনৈতিক দিকনির্দেশনাও।
একদিকে পুরোনো মিত্রতার হিসাব, অন্যদিকে নতুন অংশীদারত্বের হাতছানি। কোথাও সম্পর্কের টানাপোড়েন, কোথাও কৌশলগত ঘনিষ্ঠতার সম্ভাবনা। ভারতকে ঘিরে অস্বস্তি, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন যোগাযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে যেন খুলে গেছে একাধিক পথ।
আর সেই পথগুলোকে সামনে রেখেই বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সাংবাদিক কনক সারওয়ারের নেওয়া মার্কিন কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত জন এফ. ড্যানিলোভিচের একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার সাংবাদিক কনক সারওয়ারের ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। সম্প্রচারের পর থেকেই এই সাক্ষাৎকারটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বমহলে জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনা ও কৌতূহলের।
জানা যায় বাংলাদেশের বিগত দিনের রাজনৈতিক পথপরিক্রমা থেকে শুরু করে আগামীর সম্ভাব্য নতুন সমীকরণ-এমন আরও নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ উঠে এসেছে এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকার নিয়ে মূল্যায়ন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এই পরিবর্তনকে জন এফ. ড্যানিলোভিচ কীভাবে দেখছেন—সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন মার্কিন এই কূটনীতিক। তাঁর মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আগে বাংলাদেশ যে অবস্থায় ছিল, তার তুলনায় জুলাই বিপ্লব একটি মৌলিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। তবে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবি তাঁর। তবে পরিবর্তনের সেই সম্ভাবনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি-এমনটাই মনে করেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
অপরদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের পথচলাকেও তিনি পুরোপুরি ব্যর্থ হিসেবে দেখছেন না বলেও উঠে আসে সাংবাদিক কনক সারওয়ারের এই সাক্ষাৎকার থেকে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, জবাবদিহির প্রক্রিয়া শুরু, সংস্কারের সূচনা এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের আয়োজন-এই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচিতে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে বলে অভিমত তাঁর। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সংস্কার নিয়ে তাঁর প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল বলেও জানা যায়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
অন্যদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নবগঠিত বিএনপি সরকার নিয়েও সাক্ষাৎকার থেকে উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফল জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছে এবং বিএনপি সরকার একটি বিশাল জনসমর্থন পেয়েছে বলেও সাক্ষাৎকারে দাবি করেন।
কিন্তু নব ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের সামনে বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন জন এফ. ড্যানিলোভিচ। দীর্ঘ ২০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ও দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং সরকারের নতুন অনেক মুখ—সব মিলিয়ে অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা স্বাভাবিক বলেই মনে করেন তিনি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মূল্যস্ফীতির চাপসহ আন্তর্জাতিক নানা টানাপোড়েন-সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারকে এসব কঠিনতম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে অভিমত তাঁর।
সেই সঙ্গে নতুন সরকারের কেউ কেউ মৌলিক পরিবর্তন চান, আবার অনেকেই পুরোনো সেই পদ্ধতিতেই চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন বলেও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করা হয়। এছাড়াও বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চেয়েছিল, সেটি সেভাবেই এগিয়ে যাক—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন সাবেক মার্কিন এই রাষ্ট্রদূত।
সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, রাজনীতির এই রূপান্তরের মধ্যেও সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা দেখছেন প্রজন্মগত পরিবর্তনে। জেন-জি এবং নতুন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা, আর চল্লিশ-পঞ্চাশের কোঠায় উঠে আসা নতুন নেতৃত্ব-এই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে অতীতের চেয়ে ভিন্নভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন তিনি। এছাড়াও বিএনপি, এনসিপি ও জামায়াতের মধ্যকার টানাপোড়েনের মাঝেও সহযোগিতার কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখছেন বলেও জানান জন এফ. ড্যানিলোভিচ।
ভারতকে ঘিরে টানাপোড়েন ও ভুল তথ্য প্রচারের অভিযোগ
তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির আকাশে সবচেয়ে ঘন মেঘ যেন ভারতকে ঘিরেই। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করছে-এ বিষয়ে সাংবাদিক কনক সারওয়ার জানতে চাইলে ড্যানিলোভিচ বলেন, কাউকে আশ্রয় দেওয়া আর অপরদিকে নিজ দেশের ভূমিকে ব্যবহার করে অন্য দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দেওয়া—সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। শুধু আশ্রয় নয়, ভারত থেকে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার কর্মকাণ্ডের অভিযোগও সামনে আনেন তিনি।
শেষ পর্যন্ত হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁর ঘনিষ্ঠদের ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের মানুষের একটি অংশের মধ্যে ভারতের ভূমিকা নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করেছে বলে দাবি তাঁর।
সেই সঙ্গে যখন বাংলাদেশ ২০২৪ সালের গ্রীষ্মের নিহতদের আত্মত্যাগ স্মরণ ও শোক করছিল, ঠিক সেই সময়েই মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) ভারতীয় প্রতিষ্ঠান শেখ হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ করে দেওয়াটাও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে টানাপোড়েনের মধ্যে নিয়ে গেছে বলে উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে।
তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের আরেক বিষাক্ত জায়গা-তথ্য ও প্রচারণা। ড্যানিলোভিচের অভিযোগ, ভারতের রাজনৈতিক মহল, কিছু সাবেক কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমের একটি অংশ বাংলাদেশ নিয়ে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের গণহত্যা চলছে কিংবা দেশটি ‘পরবর্তী আফগানিস্তান’ হতে যাচ্ছে-এমন ধারণাকেও তিনি বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন এই সাক্ষাৎকারে।
ভারতীয় কূটনীতিক ও রাজনীতিকেরা প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে এতটা তৎপর এবং চাপ সৃষ্টি করছেন কেন—কনক সারওয়ারের এই প্রশ্নের উত্তরে ড্যানিলোভিচ মনে করেন, ভারত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচ্চপর্যায়ের সফর চাওয়াটা কূটনীতিতে স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তাড়াহুড়ো করে দিল্লি সফরের চেয়ে প্রথমে দ্বিপক্ষীয় জটিল বিষয়গুলো নিয়ে অর্থবহ আলোচনা এবং সমাধানের পথ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ বলে অভিমত তাঁর।
সেই কারণেই তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া তাঁর কাছে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, নির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি ছাড়া ভারত সফরে গেলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারত।
ভারতে উচ্চপর্যায়ের সফরের আগে শেখ হাসিনার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত-এ বিষয়ে তাঁর মতামত জানতে চাইলে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টিকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো বলে মনে করেন ড্যানিলোভিচ। শুধু হাসিনা নন, ভারতে থাকা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মী এবং হাদি হত্যাকারীদের বিষয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ স্বাভাবিক বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের ক্ষত নিরাময় কঠিন হয়ে পড়বে।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ও কূটনৈতিক ভারসাম্য
অপরদিকে জন এফ. ড্যানিলোভিচকে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক শক্তির উত্থান এবং নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশকেও নিজের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে লাভের পাশাপাশি ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ তাঁর। নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি এর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিকও রয়েছে। তবে তাঁর মতে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ কোন পথে—সিদ্ধান্ত নিতে হবে সেই হিসাবেই।
এছাড়াও মক্কা চুক্তি নিয়ে ভারতের উদ্বেগের জায়গাটিও উঠে আসে সাক্ষাৎকার থেকে। যদি মক্কা চুক্তি মূলত প্রতিরক্ষামূলক জোট হয়, কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সামরিক ব্যবস্থা না হয়, তাহলে ভারতের এতটা উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ দেখছেন না তিনি।
বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশটি আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তিগুলোকে কীভাবে সামলাবে—এ বিষয়েও সাক্ষাৎকারে উঠে আসে নানা বিশ্লেষণ। তাঁর মতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইউরোপ, জাপান কিংবা উপসাগরীয় দেশ—সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব বলেই মনে করেন ড্যানিলোভিচ। তাঁর কাছে ভারসাম্য মানে সবার সঙ্গে সমান মাত্রায় সম্পর্ক নয়; বরং সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগের পথ খোলা রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া।
এই ভারসাম্যের নীতিকে তিনি ‘জিরো-সাম’ রাজনীতির বিপরীত হিসেবে দেখছেন। তাঁর দাবি, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো হলেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খারাপ হতে হবে-এমন কোনো বাধ্যতামূলক সমীকরণ নেই। সবশেষে তিনি জানান, বাংলাদেশের স্বার্থ যেখানে, সেখানেই সম্পর্কের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে।
জুলাইয়ের রাজপথ থেকে শুরু হওয়া পরিবর্তন এখন যেন পৌঁছে গেছে কূটনীতির টেবিলে। সামনে একদিকে পুরোনো সম্পর্কের হিসাব, অন্যদিকে নতুন অংশীদারত্বের সম্ভাবনা। একদিকে আঞ্চলিক শক্তির চাপ, অন্যদিকে বৈশ্বিক পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এই বহুমাত্রিক সমীকরণের ভেতর বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—নিজের স্বার্থের সঠিক সংজ্ঞা নির্ধারণ করা।
কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার বোর্ডে কোনো দেশই চিরস্থায়ী বন্ধু কিংবা চিরস্থায়ী প্রতিপক্ষ নয়; স্থায়ী হলো শুধু জাতীয় স্বার্থ। ড্যানিলোভিচের বক্তব্যের সারকথা যেন এখানেই-বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে কোনো একক শক্তি নয়; কেন্দ্রে থাকতে হবে বাংলাদেশকেই।
আরও পড়ুন:







