বৃহস্পতিবার

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে সংসদে বিল উত্থাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২১:১৯

শেয়ার

র‍্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনে সংসদে বিল উত্থাপন
ছবি সংগৃহীত

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন নামে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬-এর বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন। এ সময় স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সভাপতিত্ব করেন।

উত্থাপনের পর বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। প্রথমে কমিটিকে দুই কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন ফেরত দিতে বলা হলেও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এবং বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আপত্তি জানিয়ে কর্মদিবস বাড়ানোর দাবি করেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবে চার কার্যদিবসের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়।

আইনের নাম ও কাঠামো

বিলের ১ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬ নামে অভিহিত হবে। ৪ ধারায় বলা হয়েছে, পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকবে। সরকার প্রয়োজনের নিরিখে পুলিশ বাহিনী, শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্ধারিত সংখ্যক কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল বা কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে এই ইউনিট গঠন করবে। ইউনিটের সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়। এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন, যিনি বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত হবেন। মহাপরিচালক ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন।

দায়িত্ব ও কার্যাবলি

বিলের ১০ ধারায় এসআরবির দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাস ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন, বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার এবং মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমি দস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ। এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করার দায়িত্বও থাকবে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশ অনুসারে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে ইউনিটটি।

তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা

বিলের ১২ ধারায় এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে এসব ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও বিদ্যমান অন্যান্য আইনের বিধান প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রয়োগ করতে হবে। ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, তল্লাশি, আটক, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার যে ক্ষমতা, দায়িত্ব ও কার্যাবলি রয়েছে, পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নন এমন ইউনিটের কর্মকর্তা তা প্রয়োগ করতে পারবেন। গ্রেপ্তার বা আলামত জব্দ করার পর তা এসআরবির কাছে আটকে রাখা যাবে না। ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি বা জব্দকৃত আলামত অনতিবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপক্ষের হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করতে হবে এবং এ বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

তদন্তের ক্ষমতা

আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক যেকোনো সময় এসআরবি মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনো সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন। তদন্তের সময় ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে এসআরবির হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকার কথাও বিলে বলা হয়েছে।

শৃঙ্খলা লঙ্ঘন ও আটকের বিধান

বিলের ১৭ ধারায় এসআরবি সদস্যদের বিভিন্ন শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত বা অসদাচরণ করা, অনুমতি ছাড়া গার্ড, চৌকি বা পেট্রল ত্যাগ করা, আটক বা গ্রেপ্তার থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসংগত আদেশ অমান্য করা। এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম ক্ষতি বা হারানো, অসুস্থতার ভান করা, বলপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে জমি দখল, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকাকেও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ বা আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ থাকলে তাকে আটক করার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। আটকাদেশ প্রদানকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে এবং আটক সদস্যকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। কোনো সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন অন্তর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন দিতে হবে। আটককৃত সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কোনো প্রমাণ না থাকলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।

শাস্তি ও আপিল

এসআরবি সদস্যদের শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের জন্য গুরুদণ্ড ও লঘুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুরুদণ্ড হিসেবে চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, চাকরি থেকে অব্যাহতি, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ, সর্বোচ্চ এক বছরের জ্যেষ্ঠতা বা বেতন-ভাতা বাজেয়াপ্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করার বিধান রয়েছে। লঘুদণ্ড হিসেবে অনূর্ধ্ব এক মাসের বেতনের সমপরিমাণ জরিমানা, তিরস্কার, অনূর্ধ্ব ৩০ দিনের জন্য কোয়ার্টার গার্ডে আটক, অনূর্ধ্ব ৩০ দিনের জন্য ব্যাটালিয়নে আটক রেখে অতিরিক্ত ড্রিল, গার্ড বা অন্য দায়িত্ব এবং দৈনিক দুই ঘণ্টা করে সর্বোচ্চ ১৪ দিনের জন্য শাস্তিমূলক ড্রিলের বিধান রাখা হয়েছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে এসব শাস্তি দেওয়া যাবে না। বিভাগীয় কার্যধারায় দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারের আদেশের বিরুদ্ধে মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাপরিচালকের কাছে এবং মহাপরিচালকের আদেশের বিরুদ্ধে পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে আপিল করা যাবে। আপিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

অভিযোগ প্রতিকার কমিটি ও অন্যান্য বিধান

এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংক্ষোভ নিরসনে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। কমিটিতে এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের অন্যূন এআইজি পদমর্যাদার একজন প্রতিনিধি, আইন বা বিচার প্রশাসনে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও বাস্তবায়নে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি এবং ইউনিটের পরিচালক লিগ্যাল ও মিডিয়া থাকবেন। কমিটি অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে পারবে এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে। পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যায্য আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সদস্যদের সংক্ষোভও কমিটি নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে পারবে। অভিযোগ অনুসন্ধানের সময় সাক্ষী ও দলিল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কমিটির দেওয়ানি আদালতের অনুরূপ এখতিয়ার থাকবে। বিলে এসআরবির সব সদস্যের জন্য ইউনিটে যোগদানের পর নির্ধারিত মেয়াদে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের বিধান রাখা হয়েছে। সদর দপ্তরে একটি গবেষণা সেল থাকবে, যা অপারেশনাল ও তদন্তসংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করবে। আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‍্যাব গঠনসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। তবে নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত র‍্যাবের কোর্ট পদ্ধতি ও বিভাগীয় কার্যধারা বিধিমালা, ২০০৫ প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ এসআরবির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য থাকবে। একই সঙ্গে র‍্যাব-সংশ্লিষ্ট জনবল, আদেশ, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকে থাকা অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাববহি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিল এসআরবির অনুকূলে তৎক্ষণাৎ স্থানান্তরিত এবং ন্যস্ত বা অর্পিত হবে। বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধের ধরন ও প্রকৃতির পরিবর্তন এবং জাতীয় ও জননিরাপত্তার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষায়িত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতার প্রয়োজন বাড়ছে। এতে সন্ত্রাসবাদ, সংঘবদ্ধ ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ, চরমপন্থা, মানবপাচার ও প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধে একটি আধুনিক বিশেষায়িত ইউনিটের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। বিলে আরও বলা হয়েছে, এই ইউনিটের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনের শাসন, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যেই র‍্যাবের পরিবর্তে এসআরবি প্রতিষ্ঠার জন্য এই বিল আনা হয়েছে।