মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের সম্ভাবনা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক, সরকারি ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। সরকার জোটটিকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানালেও জাতীয় স্বার্থ, সম্ভাব্য সুবিধা, সামরিক দায়বদ্ধতা এবং আঞ্চলিক সংঘাতে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে, তা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকেও জোটটির প্রতি সমর্থনের কথা এসেছে। একই সঙ্গে কয়েকজন কূটনীতিক ও বিশ্লেষক জোটে যোগদানের সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত দিয়েছেন।
মক্কা জোটের সম্প্রসারণ
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কার আল-সাফা প্রাসাদে তুরস্ককে যুক্ত করে জোটটির চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। বর্তমানে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান জোটটির সদস্য হিসেবে রয়েছে।
জোটটির মূল নীতির মধ্যে রয়েছে কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা এবং যৌথভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া।
গত ১ সেপ্টেম্বর জোটের কৌশলগত, রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা-বিষয়ক কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান জানান, জোটটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। বৈঠকে জোট সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং মিসরসহ অন্য দেশগুলোর জন্যও এটি উন্মুক্ত বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ ও মিসরসহ কয়েকটি মুসলিম দেশকে জোটের সদস্য হওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারের ইতিবাচক মনোভাব
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটি ব্যবস্থা এবং মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। বাংলাদেশের জোটে যোগদানের বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে বলেও তিনি জানান।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলেও মন্তব্য করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনো দেশের বিরুদ্ধে হুমকি নয়, বরং আত্মরক্ষার বিষয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ২৪ ও ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বলেন, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই। ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক নয় এবং সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বলে তিনি জানান।
১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, মক্কা প্যাক্টে যোগদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং দেশের জন্য অমঙ্গল হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলে জানান তিনি।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ৩১ আগস্ট প্রকাশিত মতামতে বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং সম্ভাব্য প্রভাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে সরকার জোটে যোগদানের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে জোটটির প্রতি সরকারের আগ্রহের কথাও তিনি জানান।
ইরানের অবস্থান
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানে ইরান চিন্তিত নয় বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমি। সচিবালয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কোনো সিদ্ধান্ত ইরানকে চিন্তিত করে না।
জালিল রাহিমি জানান, ইরান মক্কা চুক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তি মনে করে না। সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের কোনো চ্যালেঞ্জ বা বিরোধিতা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তুরস্ক ও পাকিস্তান ইরানের খুব ভালো বন্ধু বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী দলের সমর্থন
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের বিষয়ে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। নিজের ফেসবুক পেজে দেওয়া বার্তায় তিনি জোটটিকে মুসলিম দেশগুলোর একটি সার্বভৌম ও আত্মরক্ষামূলক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে এ ধরনের আত্মরক্ষামূলক জোট গঠন স্বাভাবিক এবং এতে বাইরের কোনো পক্ষের বিরক্ত হওয়ার যৌক্তিক কারণ নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, জোটটি বাংলাদেশের স্বার্থে কাজ করবে এবং মুসলিম দেশগুলোর ঐক্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, মক্কা চুক্তির বিষয়ে বিএনপি সরকার এখনো স্পষ্ট করেনি। সংবিধানে যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে সংসদে আলোচনা করা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র না চাইলে বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যেতে পারবে কি না, সে বিষয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
যোগদানের সম্ভাব্য সুবিধা
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের সাবেক শিক্ষক ড. এম শহীদুজ্জামান মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ঘাটতি মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ জোটে যোগ দিলে চীনও তা চাইবে। তাঁর মতে, মিসর ও বাংলাদেশকে ইতোমধ্যে জোটে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং বাংলাদেশ জোটটির পঞ্চম বা ষষ্ঠ সদস্য হতে পারে। ভবিষ্যতে ইরানও ক্রিয়েটিভ পার্টনার হিসেবে জোটে যুক্ত হতে পারে বলে তিনি মত দেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বাংলাদেশকে সামরিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক দিক থেকে বড় ধরনের সুবিধা দিতে পারে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে বিমান প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
ব্রুনাই দারুসসালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ কে এম আহসান উল্লাহ ৩০ আগস্ট মতামত দিয়ে বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়াতে পারলে এটি ইতিবাচক হবে। তাঁর মতে, এ জোট বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে শক্তিশালী অবস্থান দিতে পারে।
অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা
প্রদত্ত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জোটে যুক্ত হলে সৌদি আরবের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা, তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-এর প্রকল্পগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের সুযোগ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ এবং যৌথভাবে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও আলোচনায় এসেছে।
রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও জোটটি বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
জোটে যোগদানের ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী বলেন, সামরিক চুক্তিতে গেলে সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই রয়েছে। বাংলাদেশের স্বার্থের পাশাপাশি জোটে যোগ দিলে দেশের কী ধরনের দায় থাকবে, জোটটি ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেবে কি না এবং ভবিষ্যতে জোটটির প্রকৃতি কী হবে, সেসব বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ঢাকার সাবেক ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ ৩১ আগস্ট ঢাকার কারওয়ান বাজারে ভয়েস ফর রিফর্মের গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট মূলত যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য দেশ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তা সংশ্লিষ্ট দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে বলেও তিনি জানান।
আনিস আলমগীর বলেন, মক্কা জোটে গেলে তুরস্কের প্রযুক্তি এনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ রয়েছে। তবে জোটের সদস্যদের মধ্যে কোনো সামরিক সংঘাত হলে বাংলাদেশও তাতে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, এ কারণে জোটনিরপেক্ষ অবস্থানও বিবেচনা করা উচিত।
ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, মক্কা চুক্তি ইসলামী দেশগুলোর জন্য একটি বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। তবে বাংলাদেশের নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেখতে হবে। জোটে যোগ দিলে কী ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে এবং কোথায় কী ধরনের হুমকি তৈরি হতে পারে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থই বিবেচ্য
মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলা হলেও জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, সম্ভাব্য সুবিধা, সামরিক দায়বদ্ধতা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
জোটটির সম্ভাব্য সম্প্রসারণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও, দেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতিতে এর প্রভাব কী হবে, সেটিই এখন সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন:







