বৃহস্পতিবার

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

লুটের অস্ত্রে রমরমা বাণিজ্য, বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৩

শেয়ার

লুটের অস্ত্রে রমরমা বাণিজ্য, বাড়ছে অপরাধের ঝুঁকি
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

গণ অভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্রের একটি অংশ অপরাধী চক্রের হাতে পৌঁছে ভাড়া ও বিক্রি হচ্ছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, টার্গেট কিলিং ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে লুটের অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

রাজধানীর গাবতলীতে গত ১৮ এপ্রিল হলুদ রঙের একটি স্পোর্টস কারকে থামার সংকেত দিয়েছিল ট্রাফিক পুলিশ। কিন্তু গাড়িটি না থামিয়ে দ্রুত পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ ধাওয়া করে। একপর্যায়ে গাড়িটি থেমে গেলে এক যুবক নেমে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে সাজ্জাদ হোসেন আশিক নামে ওই যুবককে আটক করা হয়। তবে গাড়িতে থাকা অপর যুবক গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান।

পুলিশ আশিকের দেহ তল্লাশি করে একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিন উদ্ধার করে। তদন্তে দেখা যায়, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটি পুলিশের ব্যবহৃত সেমি অটোমেটিক ৯ এমএম পিস্তল। অস্ত্রটির গায়ে খোদাই করে ‘মেইড ইন ব্রাজিল’ ও ‘বিপি-এমটিসিএল’ লেখা ছিল। এ ধরনের অস্ত্র পুলিশের এসআই থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ব্যবহার করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা এখনো নিশ্চিত হতে পারেননি অস্ত্রটি কোন থানা থেকে লুট হয়েছিল। তবে গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ধানমন্ডিতে একটি গ্রুপের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকার সুমন আজাদ চৌধুরীর ছেলে শাহরিয়ার চৌধুরী। পরে তিনি একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকায় অস্ত্রটি কিনেছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া যায়। অস্ত্রের মূল মালিক শাহরিয়ার গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ওই দিনই দেশ ছাড়েন। তিনি গ্রেপ্তার না হওয়ায় কোন গ্রুপের কাছ থেকে অস্ত্রটি কেনা হয়েছিল, তা নিশ্চিত হতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা।

লুটের অস্ত্র ভাড়ায় দিত অটো সজল

গত ২ মার্চ স্বামীবাগ এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের সময় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমানকে গুলি করার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা তিনটি পিস্তল ও একটি রিভলবারের উৎস হিসেবে শীর্ষ মাদক কারবারি অটো সজলের নাম আসে।

পরে পুলিশ অটো সজল, তার ভাই সজীবসহ চক্রের আরও কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে আরও ছয়টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। সজল ও তার ভাইয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা উদ্ধার হওয়া অস্ত্রগুলোর মধ্যে চারটি ওয়ারী থানা থেকে লুট করা হয়েছিল।

জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পারে, অটো সজল লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের কাছে উচ্চমূল্যে ভাড়া দিতেন।

বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহারের অভিযোগ

গণ অভ্যুত্থানের সময় সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে অস্ত্র লুট করে অপরাধী চক্রগুলো মজুত করে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। শুরু থেকেই আশঙ্কা করা হয়েছিল, এসব অস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঝুঁকি আরও বাড়বে।

বাস্তবেও দেশের বিভিন্ন স্থানে লুটের অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক সাম্রাজ্য রক্ষা, টার্গেট কিলিং ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধে এসব অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

গোয়েন্দারা বলছেন, শুধু অপরাধে ব্যবহার নয়, লুটের অস্ত্র ভাড়া ও বিক্রির মাধ্যমে একটি বাণিজ্যও গড়ে উঠেছে। একপর্যায়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্রের ছবি প্রকাশ করে প্রকাশ্যে বিক্রির চেষ্টার ঘটনাও দেখা গেছে।

গেন্ডারিয়ায় গুলির ঘটনায় লুটের অস্ত্রের সন্দেহ

গত রবিবার সন্ধ্যায় গেন্ডারিয়ার মুন্সিরটেক এলাকায় দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে এক নারীসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ঘটনাস্থল থেকে ২০টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র জানিয়েছে, ওই এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ করে অটো সজল ও তার ভাই সজীব। সম্প্রতি তারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় মাদকের বাজারে তৃতীয় কোনো শক্তির উত্থান ঠেকাতে এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়ে থাকতে পারে।

পুলিশের ধারণা, এ ঘটনায় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ অটো সজল ছাড়াও তার প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর কাছে লুটের অস্ত্র মজুত রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩১০ অস্ত্র

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গণ অভ্যুত্থানের সময় মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। এর মধ্যে গত ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ৪ হাজার ৪৫৩টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩১০টি অস্ত্র।

উদ্ধার না হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ১০৯টি চায়না রাইফেল, একটি বিডি রাইফেল, ৩০টি এসএমজি, তিনটি এলএমজি, ২০৩টি ৭.৬২ চায়না পিস্তল, ৪৪৩টি ৯ এমএম পিস্তল, ৩৮৪টি ১২ বোর শটগান, ১২৮টি গ্যাস গান, সাতটি গ্যাস লঞ্চার এবং দুটি ২৬ মি.মি. সিগন্যাল পিস্তল।

এ ছাড়া ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮০০টি গুলি, ১১ হাজার ৩৯১টি টিয়ার গ্যাস সেল, ২৯১টি টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড, ১ হাজার ১৬৮টি সাউন্ড গ্রেনেড, ৪১টি কালার স্মোক গ্রেনেড, ২২টি সেভেন/মাল্টিপল ব্যাং স্টান গ্রেনেড, ২৮৪টি ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড এবং ১১৬টি হ্যান্ডহেল্ড টিয়ার গ্যাস স্প্রেও উদ্ধার হয়নি।

র‌্যাবের নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযান

লুটের অস্ত্র উদ্ধারে র‌্যাবের নেতৃত্বে সমন্বিত অভিযান জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও অন্যান্য সংস্থা সহযোগিতা করবে। অস্ত্র বাইরে থাকলে এর কেনাবেচা ও অপব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিভিন্ন তৎপরতাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেখছে। সে কারণে অস্ত্র উদ্ধারের কার্যক্রম কিছুটা ধীরগতিতে এগিয়েছে। সমন্বিত অভিযান জোরদার হলে উদ্ধারের সফলতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে গত শনিবার রাজধানীর রাজারবাগে পুলিশের ত্রৈমাসিক অপরাধ সভার উদ্বোধন শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, লুট হওয়া অস্ত্রের সন্ধান বা তথ্য দিলে ১০ হাজার টাকা থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হবে।