দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা থেকে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বাদ পড়ার পরও এসব মেশিনের সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তি নিয়ে বিপাকে পড়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে কেনা প্রায় দেড় লাখ ইভিএমের মধ্যে ৮৬ হাজার ২৩৩টি বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) লিমিটেডের ওয়্যারহাউসে পড়ে আছে। এসব ইভিএমের গুদামভাড়া বাবদ বিএমটিএফ ৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা দাবি করেছে। বকেয়া পরিশোধ ও ওয়্যারহাউস খালি করতে প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) ইসিকে চিঠি দিয়েছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পরিত্যক্ত ইভিএম সংরক্ষণে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩২ লাখ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ইসিকে। বিভিন্ন স্কুলেও এসব মেশিন পড়ে আছে। ফলে সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের কক্ষেও পড়ে আছে ইভিএম
কক্সবাজারের রামুতে খিজারী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের কনফারেন্স রুমে চার বছর ধরে রাখা হয়েছে ৪১০টি ইভিএম। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, পরীক্ষা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অভিভাবক সমাবেশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে মঙ্গলবার (২২ জুলাই) স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে অভিযোগ জানিয়ে প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
তবে সার্বিকভাবে ইভিএম সংরক্ষণ ও নিষ্পত্তির সমস্যার এখনো কোনো সমাধান দিতে পারেনি ইসি।
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন শুরু থেকেই ইভিএমগুলো নিয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে। তবে এখনো মেশিনগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য নির্ধারণ হয়নি। যেহেতু ইভিএম আর ব্যবহার করা হবে না, সেহেতু ডিসপোজাল বা নিষ্পত্তি ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন নির্বাচন কর্মকর্তারা।
এরই মধ্যে ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তা, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে ইভিএমের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটি কাজ করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জে পড়ায় একটি ইনভেন্টরি কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শামসুল আলম বলেন, একজন নির্বাহী হাকিমসহ আরও অনেকের সমন্বয়ে ওই কমিটি করা হবে। কমিটি ইভিএমগুলোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিষ্পত্তি করবে।
দুদকের তদন্ত, অডিট আপত্তিও রয়েছে
ইসি সচিবালয়ের আরেকটি সূত্র জানায়, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ইভিএম প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে অডিট অধিদপ্তর এ-সংক্রান্ত প্রকল্পে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের আপত্তি তুলেছে, যা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এসব কারণে বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া কঠিন।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ইভিএম নিয়ে মামলা চলমান। এর পরও যে কমিটি করা হয়েছে, তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ইভিএম আর ব্যবহার করা হবে না। ফলে এগুলোর নিষ্পত্তি দরকার।
আরেক নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ইভিএমগুলো স্টোরে রাখা আছে। নষ্টও হয়ে যাচ্ছে। এগুলোর কী ব্যবস্থা হবে, তা নির্ধারণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
মাঠ পর্যায়েও বাড়ছে সংরক্ষণ ব্যয়
শরীয়তপুর জেলা নির্বাচন অফিসার মিজানুর রহমান জানান, সেখানে একটি বাণিজ্যিক ভবনের পুরো একটি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার ইভিএম রাখা হয়েছে। খরচ কমাতে শরীয়তপুরের পাশাপাশি মাদারীপুর ও গোপালগঞ্জের ইভিএমও সেখানে রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে প্রায় এক লাখ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। গত জুন পর্যন্ত ভাড়া পরিশোধ করা হয়েছে। ভাড়া দিতে একটু দেরি হলেই ভবন মালিক এসে চাপ সৃষ্টি করেন।
খুলনা অঞ্চলের এক নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, আগে খুলনা বিভাগের ১০টি জেলায় ইভিএম রাখা ছিল। এখন তা কমিয়ে সাতটি জেলায় রাখা হয়েছে। কমিশন থেকে খরচ কমাতে বলা হয়েছে। ইভিএম সংরক্ষণে গড়ে প্রতি জেলায় মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। ভাড়ার টাকা দিতে ইসি চুক্তিবদ্ধ। বিষয়টি যত দ্রুত নিষ্পত্তি হবে, ততই সরকারের ভালো।
বিভিন্ন গুদামে পড়ে আছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ইভিএম
সূত্র জানায়, বর্তমানে বিএমটিএফে ৮৬ হাজার ২৩৩টি, সিলেট অঞ্চলে ২ হাজার ৬০৭টি, রাজশাহী অঞ্চলে ১৩ হাজার ৫৩০টি, রংপুর অঞ্চলে ৪ হাজার ৪০৫টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৬ হাজার ৪২৮টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ হাজার ১৩৫টি, খুলনা অঞ্চলে ৭ হাজার ১২টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ হাজার ৮৭৫টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৮৫টি, বরিশাল অঞ্চলে ৫ হাজার ৮৭টি এবং ঢাকা অঞ্চলে ৭ হাজার ৪২৯টি ইভিএম গুদামে পড়ে রয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট ও দুটি উপজেলা নির্বাচন অফিসে আগুনে ১৫৭টি ইভিএম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে ইসির হিসাবে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪০১টি ইভিএম রয়েছে। বাকি ১ হাজার ৫৯৯টির কোনো হদিস নেই।
প্রতিটি ইভিএম প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দরে কেনা হয়েছিল। সে হিসাবে হদিস না থাকা ১ হাজার ৫৯৯টি ইভিএমের মূল্য প্রায় সাড়ে ৩৭ কোটি টাকা।
তড়িঘড়ি করে নেওয়া হয়েছিল ইভিএম প্রকল্প
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের ২১ নভেম্বর ইসিকে দেশের সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর পর ২০১১ সালের ২৯ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ইভিএম চালুর লক্ষ্যে দ্রুত প্রকল্প প্রস্তাব দিতে ইসি সচিবালয়কে বলা হয়।
ওই নির্দেশনার পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কে এম নূরুল হুদার কমিশন বিএমটিএফ থেকে বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন ব্যবস্থার উন্নতমানের ইভিএম কিনতে প্রকল্প নেয়। এতে ব্যয় ধরা হয় ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। অথচ ওই নির্বাচনে মাত্র ছয়টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।
পরে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা করে হাবিবুল আউয়াল কমিশন। সে কারণে নতুন করে আরও দুই লাখ ইভিএম কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়। তবে ব্যাপক সমালোচনার কারণে তৎকালীন সরকার শেষ পর্যন্ত ওই প্রকল্প অনুমোদন করেনি।
২০২৪ সালের জুনে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলে ইভিএম প্রকল্পের সব জনবল নির্বাচন কমিশনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় নেয়। প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ইভিএমের জন্য এক বছরের ওয়ারেন্টি এবং পাঁচ বছরের সাপোর্ট সার্ভিসের কথা উল্লেখ ছিল। তবে এত মেশিন কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
কথিত উন্নতমানের ইভিএমের আগে বুয়েটের তৈরি কম দামের ইভিএম ব্যবহার শুরু করেছিল নির্বাচন কমিশন। পরে ওই ইভিএম ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে ব্যবহার বন্ধ করে দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ড. শামসুল হুদা কমিশন প্রথম পর্যায়ে বুয়েট থেকে ১৩০টি ইভিএম সংগ্রহ করে।
আরও পড়ুন:







