১৪ বছর। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে, একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বাংলাদেশ—সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনিকে কারা হত্যা করেছিল, এবং কেনইবা তাদের হত্যা করা হয়? কালের আবর্তে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টালেও, কোনো এক অদৃশ্য ছায়ার ঘেরাটোপে, গত ১৪ বছরেও, সেই সাংবাদিক দম্পতি, হত্যারহস্যের জট খোলেনি।
নতুন সূত্রে জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর নাম
সম্প্রতি সেই দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝেই সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যা মামলার দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তদন্তে নতুন সূত্রের সন্ধান পেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা। যে যোগসূত্রে আওয়ামী লীগ-দোসরখ্যাত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সম্পৃক্ততা ঘিরে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
সূত্র বলছে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তারা বিডিআর হত্যাকাণ্ডের বর্বরোচিত ঘটনার রহস্য উন্মোচন নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সেই ডকুমেন্টারি প্রকাশের আগেই তাদের হত্যা করা হয় বলে সূত্রে উঠে আসে। হত্যার পর ঘরের স্বর্ণালংকারসহ অন্যান্য আসবাবপত্র অক্ষত থাকলেও, তাদের ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন উধাও হওয়ার কথা জানা যায়।
সূত্র মতে, সাগর-রুনি হত্যার আগে ও পরে র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান জিয়াউল আহসান, অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর সঙ্গে ২০ বারেরও বেশি কথা বলেন। সাগর-রুনি হত্যার দুই-একদিন পর জিয়াউল আহসান তার বিশ্বস্ত এক সহকারীকে রোকেয়া প্রাচীর কাছে পাঠালে সেই বিশ্বস্ত সহকারী, দুটি ডিভাইস নিয়ে আসেন বলে সূত্রে উঠে আসে। কথোপকথন থেকে জানা যায়, সেই দুটি ডিভাইসেই সাগর-রুনির করা বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি ডকুমেন্টারি ছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা আইসিটির তদন্তকারীরা সম্প্রতি বিগত সরকারের আমলের একটি গুমের ঘটনার তদন্ত করতে নামলে সাবেক বিতর্কিত সামরিক কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের কল রেকর্ড বিশ্লেষণে আরেক সাবেক সেনা সদস্যের নাম উঠে আসে। পরবর্তীতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই বেরিয়ে আসে এমন সব বিস্ফোরক তথ্য।
আসিফ নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি
বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মাঝেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়েছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও অ্যাক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসাইন। সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের জন্য, রোকেয়া প্রাচীর প্রাক্তন স্বামী ও সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি করেছেন তিনি। পোস্টে আরো লেখেন, ২০১২ সালে যে সময় সাগর-রুনি মারা যান, তখন রোকেয়া প্রাচী আসিফ নজরুলের স্ত্রী ছিলেন। স্ত্রী এতো বড় ঘটনায় জড়িত থাকলে, স্বামী হিসেবে সবই জানতেন আসিফ নজরুল, প্রশ্ন রেখে এমন ইঙ্গিত করেন ইলিয়াস হোসাইন। স্ত্রী পলাতক থাকায়, প্রাক্তন স্বামীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যেতে পারে বলে, লেখায় উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে, গত রবিবার (৩০ আগস্ট) ট্রাইব্যুনালের তদন্তে উঠে আসার বিষয়টি জানতে ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত হন সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মেঘ। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামসহ, অন্যান্য প্রসিকিউটরের সঙ্গে এ বিষয়ে তাদের পরিবার কথা হয় বলেও জানা যায়।
১৪ বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
গত ১৪ বছর ধরে যে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এগোয়নি কাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে, সেখানে এবার অন্য একটি মামলার সূত্র ধরে উঠে এসেছে নতুন এক সম্ভাবনা। কিন্তু এই নতুন তথ্যের মধ্যেই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে পুরোনো সেই দীর্ঘ অপেক্ষার ছবি।
শনিবার (১১ ফেব্রুয়ারি) ২০১২ সালে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি। তাদের চার বছরের সন্তান মেঘ তখন ওই বাসাতেই ছিল। ঘটনার পর রুনির ভাই নওশের আলম রোমান শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন।
সমালোচনা রয়েছে, শুরুতে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা—ডিবি। পরে সেই তদন্ত যায় র্যাবের হাতে। কিন্তু, একের পর এক সময় পেরিয়ে গেলেও আদালতে জমা পড়েনি তদন্ত প্রতিবেদন।
অভিযোগ রয়েছে, শুধু র্যাবের সময়ই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় নেয়া হয় ১১১ বার। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত এই তদন্তে প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা পিছিয়েছে ১২৯তম বারের মতো। একটি মামলায় ১২৯ বার সময়ের দরজা খুলেছে, তবুও খোলেনি হত্যারহস্যের দরজা।
দীর্ঘ এই অচলাবস্থার মধ্যেই সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ২০২৪ সালে হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চার সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করে। তাদেরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু বারবার সময়ের সীমারেখা শেষ হলেও শেষ হয়নি তদন্ত।
অপরদিকে, হাইকোর্ট চলতি বছরের রবিবার (২৬ এপ্রিল) টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দেয়, বলেও তথ্য রয়েছে। বর্তমানে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। আর এর মধ্যেই অন্য একটি তদন্ত থেকে উঠে আসা, নতুন তথ্য এখন নতুন করে আলোচনায় এনেছে ১৪ বছর ধরে অমীমাংসিত এই হত্যাকাণ্ডকে।
সব মিলিয়ে, সাগর-রুনির হত্যা রহস্য গত ১৪ বছরে কোনো এক অদৃশ্য ছায়ার ঘেরাটোপে চাপা থাকলেও বর্তমানে যেন তার গুমোট ফাঁসের পথে। কিন্তু এবারও কি সেই অদৃশ্য শক্তির বেড়াজালে আবারও ধামাচাপা পড়ে যাবে এই হত্যারহস্য? নাকি বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই রহস্য এবার উন্মোচিত হবে? সেই প্রত্যাশাতেই এখন সাগর-রুনির পরিবারসহ পুরো দেশ।
আরও পড়ুন:







