মানিকগঞ্জে এক মতবিনিময় সভায় ভারতের আদানি গ্রুপ বিদ্যুৎ নিয়ে খেলা করছে এবং সরবরাহ কমিয়ে সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। সোমবার (৩১ আগস্ট) বেলা ১২টায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে ওই সভার আয়োজন করা হয়।
বিদ্যুৎ সংকট ও গ্যাস কূপ খনন প্রসঙ্গে
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অতীতের সরকার কোনো গ্যাস কূপ খনন করে যায়নি। যা রিজার্ভ ছিল তা দিয়েই এখনো কার্যক্রম চলছে। নতুনভাবে কিছু গ্যাস কূপ খনন শুরু হয়েছে এবং তা দ্রুতগতিতে করা হচ্ছে। গ্যাস না থাকা সত্ত্বেও বিগত সরকার গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে লুটপাট করেছে এবং সেই কেন্দ্রগুলো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। ডিজেলচালিত ও কয়লাচালিত ৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সচল করার জন্য অতি উচ্চমূল্যে বিশাল আকারে এলপিজির স্টক কেনা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে ৯ থেকে ১০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির অভিযোগ
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আগে ঠিকাদাররা মন্ত্রীর কক্ষে ঘোরাঘুরি করতেন এবং পিয়নদের টাকা দিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে নার্স ও চিকিৎসকের বদলির জন্য স্বাক্ষর নিতেন। পরিচালক পর্যায়ে ৩ লাখ, ৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। পুরো চিত্র দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ ছিল এবং সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে তিনি রয়েছেন, সেখানে ১৭ বছর জনগণের স্বাস্থ্যসেবার জন্য কোনো কাজ করা হয়নি। মানুষকে ওষুধ দেওয়া হয়নি, নতুন কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। দেশে ১৮ কোটি মানুষের জন্য প্রতি ১১ হাজার মানুষে একজন চিকিৎসক রয়েছেন। চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে। ফরিদপুর ও বরিশালে দুটি এমআরআই মেশিন পড়ে আছে। মানুষের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় এই যন্ত্র ১৮ কোটি টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে এবং প্রতিটি থেকে ৭ কোটি টাকা করে আত্মসাৎ করা হয়েছে। মেশিনগুলো যেভাবে কেনা হয়েছে সেভাবেই প্যাকেট অবস্থায় রয়েছে। জনবল ও টেকনিশিয়ান না থাকায় অনেক যন্ত্র কিনে ফেলে রাখা হয়েছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার শুধু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে এবং তা এখন অকেজো হয়ে গেছে, যা ভাঙারি হিসেবে বিক্রি ছাড়া উপায় নেই। কোনো হাসপাতালে আসন বৃদ্ধি করা হয়নি এবং নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করা হয়নি।
ছয় মাসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের উপস্থিতি শতভাগ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন বলে তিনি জানান। এখন যেখানেই যান, চিকিৎসক ও নার্স পাওয়া যায়। রোগীদের সঙ্গে আলোচনায় সেবার মান বৃদ্ধি পেয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
মাদক, জুয়া ও আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে
মাদক ও জুয়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নেশা সমাজে বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করা হয়েছে। মাদক, ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক ও জুয়া, অনলাইন জুয়া নির্মূল করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একদিকে আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে, অন্যদিকে পিতা-মাতাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মায়েদের বোঝাতে হবে যেন তাদের সন্তানরা সন্ধ্যা বাতির পর বাইরে না থাকে।
মাদকসেবীদের বিষয়ে পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো মাদকসেবনকারী কারও ঘরে বসে মাদক সেবন করলে ঘরের মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে গ্রেপ্তার করতে হবে। কারও বাড়ির পাশে টং দোকানে বসে সেবন করলেও সবাইকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনতে হবে। তারা জামিন নিলেও আবার গ্রেপ্তার করতে হবে। দেশে চুরি, ডাকাতি ও ধর্ষণের মতো অপরাধ নেশার কারণে সংঘটিত হয়।
ধর্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সজাগ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। নারীদের প্রতি সম্মান রেখে এ ধরনের ঘটনায় জড়িত একজন নয়, সংশ্লিষ্ট সবাইকে গ্রেপ্তারের আওতায় আনতে হবে। রামিসা হত্যার বিচার সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে সরকার সক্ষম হয়েছে, যা একটি বড় সাফল্য।
দুর্নীতি ও নির্বাচন প্রসঙ্গে
দুর্নীতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, গত ১৭ বছরে দুর্নীতি কঠিনভাবে বাসা বেঁধেছে। বিগত সময়ে নির্বাচন এলে ইউএনও ১ কোটি টাকা, থানার পরিধি অনুযায়ী ওসি সর্বনিম্ন ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা এবং ডিসি ১ কোটি টাকা পেতেন। এটি ছিল ঘুষ ও দুর্নীতির মহাঅরণ্য। এবারের নির্বাচনে কেউ ১০ টাকাও পায়নি। তিনি কাউকে দেননি এবং কেউ চায়ওনি। আগের চেয়ে বেশি কাজ হয়েছে এবং তা ন্যায়ের কাজ, যা জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে।
তিনি বলেন, দেশকে টিকিয়ে রাখতে দুর্নীতি, নেশা ও জুয়া বন্ধ করতে হবে, শিশুদের বাঁচাতে হবে এবং চিকিৎসার মান উন্নয়ন করতে হবে। এ জন্য কঠোর পরিশ্রম ও তদারকি প্রয়োজন। তদারকি ঘরে বসে হয় না, জনগণের কাছে যেতে হবে। সিভিল সার্জন, ওসি ও ডিসি শুধু চেয়ারে বসে ফাইলে স্বাক্ষর করার জন্য নন, সমাজে নেমে কাজ করতে হবে।
সভায় মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, মানিকগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য এস এ জিন্নাহ কবির, মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মইনুল ইসলাম খান শান্ত এবং জেলায় কর্মরত প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন:







