দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের ঘটনা সারা দেশের মানুষকে স্তম্ভিত করেছে। এসব ঘটনার তদন্ত, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা এবং সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
গত শনিবার (২৯ আগস্ট) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের টানে রিকশা থেকে পড়ে রনজিনা পারভীন (৫৫) নামে এক প্রধান শিক্ষিকার মৃত্যু হয়। শনিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বগুড়া থেকে ঢাকায় এসে ফার্মগেটের একটি হাসপাতালে যাওয়ার পথে এ ঘটনা ঘটে।
মোটরসাইকেলে আসা ছিনতাইকারীরা তাঁর ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি রিকশা থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাঁকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাই নিয়ে প্রশ্ন
জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে সংসদ ভবনের সামনে এ ধরনের ঘটনা ঘটায় বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। ছিনতাইয়ের ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। তবে সংসদ ভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত এলাকার সামনে এমন ঘটনা ঘটায় প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে যদি কেউ নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত।
এ ঘটনাটি নিছক ছিনতাইয়ের জন্য, নাকি খবরের শিরোনাম হওয়ার জন্য সংঘটিত হয়েছে, সে প্রশ্নও উঠেছে। একটি সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন
এর আগের সপ্তাহে শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে রংপুরের দাসপাড়া মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
পরে ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের আগেই স্থানীয় দুই ব্যক্তি মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ওই দুই ব্যক্তিই গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, কন্যা ও পুত্রকে একে একে হত্যা করেছে।
পরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠতে দেখা যায়। হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল কি না, নিহত এক নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন কি না, মাদকাসক্ত দুই ব্যক্তি চারজনকে হত্যা করতে পারে কি না এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
খুনি সন্দেহে আটক ব্যক্তি ও পুলিশ কর্মকর্তার একই রকম শার্ট কেন, আসলেই মাদক গ্রহণে বাধা দেওয়ায় হত্যাকাণ্ড, নাকি এটি ডাকাতির ঘটনা, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পরও কেন সন্দেহভাজনরা ঘটনাস্থলে অবস্থান করছিল, নিহতদের শরীরে বা পোশাকে কিংবা ঘটনাস্থলে সন্দেহভাজনদের ডিএনএ বা আঙুলের ছাপ পাওয়া গেছে কি না, এমন প্রশ্নও উঠছে।
নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ের চোয়াল ভাঙা ছিল কি না, তা নিয়ে পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যের অমিল নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন ও সন্দেহের কথা বলছেন।
তদন্ত নিয়ে অবিশ্বাস নতুন নয়
চাঞ্চল্যকর অপরাধ, বিশেষ করে অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুলিশের তদন্ত নিয়ে অবিশ্বাস বা সন্দেহ তৈরির ঘটনা এটাই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে পুলিশের তদন্ত প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা, কুমিল্লার তনু হত্যা, মেজর সিনহা হত্যা, ফেনীর নুসরাত হত্যা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক হত্যা মামলাসহ আরও কয়েকটি মামলার তদন্ত বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
অনেক সময় ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের আগেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের অনুমাননির্ভর বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। স্পর্শকাতর বিষয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে একেক কর্মকর্তা বা একেক সংস্থার প্রধানের ভিন্ন বক্তব্যের কারণে জনগণের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়।
রংপুরের ঘটনাকে এর সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের বক্তব্য নিছক অভিজ্ঞতার অভাবের ফল, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলেও আলোচনা হচ্ছে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব বিএনপি পেলেও রংপুরের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিরোধীদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রশাসন থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও বিরোধী দলের নেতাদের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ কারণে রংপুরের ঘটনাকে নিছক একটি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তিন মাসে ৯১৫ হত্যাকাণ্ডের মামলা
দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক কোন্দল, আন্ডারওয়ার্ল্ডের আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষে দেশজুড়ে খুন, টার্গেট কিলিং ও বন্দুক হামলার ঘটনা বেড়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে সারা দেশে ৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের বিস্তার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্বলতা এবং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শীর্ষ অপরাধীদের মুক্তি ও দেশে ফিরে আসা সহিংসতা বাড়ার অন্যতম কারণ।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল রাজপথে এসে ঠেকেছে বলেও মনে করা হচ্ছে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে, যার ফলে দেশজুড়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ও হত্যাকাণ্ড ঘটছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ
দেশের আইন-শৃঙ্খলার নাজুক অবস্থা বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের অভিযোগ, ওই সময়ে মব, দখল, চাঁদাবাজি ও লুটপাটের ঘটনাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচটি কর্মকাণ্ডকে দায়ী করা হচ্ছে।
প্রথমত, ড. ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর জেল থেকে চিহ্নিত ও দণ্ডিত অপরাধীদের মুক্তি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং অনেকে জঙ্গি সংগঠনের নেতা বলে দাবি করা হচ্ছে। ঢালাওভাবে মুক্তি দেওয়ার ফলে তারা নতুন করে সংগঠিত হয়েছে এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে ভূমিকা রাখছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ড. ইউনূসের শাসনামলে মব সন্ত্রাস ব্যাপক আকার ধারণ করে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। একটি গোষ্ঠী মব সৃষ্টি করে রাষ্ট্রীয় মদদে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি রয়েছে। বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। এসব ঘটনার মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে এবং তারা এখনো সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, ওই সময়ে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় বলে অভিযোগ রয়েছে। রাস্তাঘাটে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, মবের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাকে অপমান এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও স্থাপনা ভাঙচুরের ঘটনায় বিচার হয়নি বলে সমালোচকেরা অভিযোগ করছেন। এ বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চতুর্থত, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে পুলিশ বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশ সদস্যদের মনোবল তলানিতে নেমে যায় এবং পরবর্তী সময়ে নেওয়া কিছু পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
পুলিশ বাহিনীকে বিভিন্নভাবে অপমান করার ফলে তারা অনেকাংশে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং সেই অবস্থা থেকে এখনো পুরোপুরি বের হতে পারেনি বলে দাবি করা হচ্ছে।
পঞ্চমত, আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা ওই সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর কিছু তরুণ ও যুবক নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে মনে করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের প্রতি অবমাননা করা হয়েছে বলেও সমালোচনা করা হচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে মাত্র ছয় মাসের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা কঠিন বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার অভিযোগ
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে পরিকল্পিতভাবে কিছু ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যাতে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়, এমন অভিযোগও উঠেছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তৈরির নেপথ্যে একটি বিশেষ মহলের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর পেছনেও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন।
এ পরিস্থিতিতে সরকারকে সতর্ক থেকে কাজ করতে হবে বলে মত দেওয়া হচ্ছে। কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সংযত ভাষায় কথা বলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় কথা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সরকারকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আরও পড়ুন:







