বৃহস্পতিবার

২৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২ ভাদ্র, ১৪৩৩

নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল জিতেছেন রবীন্দ্রনাথ?

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৭ আগস্ট, ২০২৬ ২০:২৮

শেয়ার

নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল জিতেছেন রবীন্দ্রনাথ?
ছবি বাংলা এডিশন

এক হাতে বাঁশরী, অন্য হাতে রণতূর্য-এক হাতে প্রেম, অন্য হাতে বিদ্রোহের কারুকার্য। যে কণ্ঠ কখনো গেয়েছে সাম্যের গান, সেই কণ্ঠই আবার কখনো তুলেছে শোষকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন। যে কলম কখনো এঁকেছে প্রেমের কোমল ছবি, সেই কলমই আবার অন্যায়, শোষণ আর পরাধীনতার বিরুদ্ধে হয়ে উঠেছে আগ্নেয়াস্ত্র। কালপরিক্রমায় সেই কণ্ঠ আজ নীরব, কিন্তু তাঁর শব্দ আজও জীবন্ত।

দ্রোহ, মানবতা আর সাম্যের সেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বিশ্লেষকদের মতে বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি এক অনন্য ধূমকেতু-হঠাৎ তার দীপ্ত আবির্ভাব, আর সেই দীপ্তির আলো আজও স্মৃতির আকাশে অম্লান। যুগে যুগে তাঁর প্রতিটি শব্দ বাঙালির শিরায় শিরায় জাগিয়েছে দ্রোহের আগুন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং সত্যের পথে চলার শক্তি।

আজ তাঁর ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। জানা যায় বাংলা ১৩৮৩ সালের ১২ই ভাদ্র ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে নিভে যায় কাজি নজরুল ইসলামের জীবনপ্রদীপ।

জন্ম ও শৈশব

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায় ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী পরিবারে জন্ম নজরুলের। শৈশবেই দারিদ্র্য ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই দারিদ্র্য তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। বরং সেই অভাবই যেন তাঁর ভেতরে জ্বালিয়ে দিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার এক অদৃশ্য স্পৃহা। জীবন তাঁকে যতবার বঞ্চনার মুখোমুখি করেছে, ততবারই তিনি শব্দের মশাল হাতে দাঁড়িয়েছেন তার বিপরীতে।

সৃষ্টিশীল জীবন

তথ্য বলছে মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে দিয়ে গেছেন কালজয়ী অসংখ্য সৃষ্টি। কবিতা থেকে গান, গজল থেকে হামদ-নাত-সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনেই ছিল তাঁর সমান পাণ্ডিত্য ও অনন্য বিচরণ। তাঁর লেখায় যেমন রয়েছে প্রেমের কোমলতা, তেমনি রয়েছে বিদ্রোহের বজ্রনিনাদ। কখনো তিনি প্রেমিক, কখনো মানবতার কবি, কখনো সাম্যের কণ্ঠস্বর, আবার কখনো শোষিত মানুষের হয়ে উচ্চারিত এক দুর্বার বিদ্রোহ।

বিদ্রোহী কবিতা ও কারাবরণ

বিশেষ করে তাঁর লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে এনে দেয় এক নতুন পরিচয়-দিয়ে যায় ‘বিদ্রোহী কবি’-র উপাধি। বিশেষজ্ঞদের মতে তাঁর সেই বিদ্রোহী কবিতায় রয়েছে অন্যায়, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে এক অমর দ্রোহের ভাষা। সে সময় মানুষের শোষণ-বঞ্চনা ও ঔপনিবেশিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে যেন তাঁর কলম হয়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য কামানের বারুদ; আর তাঁর শব্দে জ্বলে উঠেছিল মুক্তি, সাম্য ও মানবতার দীপ্ত অগ্নিশিখা।

ইতিহাস বলছে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় তিনি শুধু লেখেননি, সেই লেখার চরম মূল্যও তাঁকে দিতে হয়েছিল। প্রতিবাদের শব্দ উচ্চারণের অপরাধে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। ১৯২২ সালে ব্রিটিশবিরোধী লেখালেখির কারণে গ্রেপ্তার হন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনে। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ইতিহাসবিদদের দাবি কারাগারের লোহার শিকল তাঁর কণ্ঠকে বন্দি করতে পারেনি। বরং ‘কারার ঐ লৌহকপাট’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টিতে তিনি শোষণ, পরাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে উচ্চারণ করেছেন দুর্বার প্রতিবাদ। কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে তাঁর শব্দ পৌঁছে গিয়েছিল মানুষের হৃদয়ে, জাগিয়ে তুলেছিল মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও বিদ্রোহের চেতনা।

ইসলামি সাহিত্যে অবদান

শুধু বিদ্রোহ নয়, কাজী নজরুল ইসলামের ইসলামি সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সংগীতে বিশাল অবদানও রয়েছে বলে জানা যায়। বিশেষজ্ঞদের দাবি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়, ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যকে তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিসরে শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন নানা সময়ে। তাঁর লেখা ‘মোহররম’, ‘কোরবানী’, ‘শহীদ’, ‘ইসলামের জয়’ প্রভৃতি কবিতায় উঠে আসে ইসলামের ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও চেতনার প্রতিফলন।

পাশাপাশি ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’ তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে’-সহ তাঁর অসংখ্য হামদ, নাত, গজল ও ইসলামী সংগীত আজও বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় আবেগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

সমালোচনা

সমালোচনা রয়েছে—কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা চুরি করেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পেয়েছেন। বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়, নজরুলের স্ত্রী প্রমীলা সেনগুপ্ত কাজী নজরুল ইসলামকে ধুতুরার ফল খাইয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলেন। এরপর তাঁর লেখা ও রচনাগুলো চুরি করে রবীন্দ্রনাথের কাছে তুলে দেওয়া হয়। আর সেই লেখাই নাকি চুরি করে রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন-এমন দাবিও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।

বাংলাদেশে আগমন ও সম্মান

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্কও হয়ে ওঠে আরও গভীর, আরও আত্মিক। তথ্য বলছে, ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পর তাঁকে দেওয়া হয় ‘জাতীয় কবি’-র মর্যাদা। রাষ্ট্রীয় সম্মান ও মর্যাদায় তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা করা হয় রাজধানীর ধানমন্ডিতে।

এছাড়াও ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রিতে ভূষিত করে। এরপর ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কারগুলোর অন্যতম ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে।

আজ পাঁচ দশক পরও তাঁর মৃত্যু যেন কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি নয়; বরং এক জীবন্ত শব্দের অনন্ত যাত্রা। তাঁর কণ্ঠ থেমেছে, কিন্তু থামেনি তাঁর কবিতা। তাঁর চোখ বন্ধ হয়েছে, কিন্তু নিভে যায়নি তাঁর স্বপ্ন। তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে পাঁচ দশক আগে, অথচ তাঁর শব্দের আগুন আজও জ্বলছে-অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে।