চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে মানবিকতার আড়ালে একের পর এক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও ভয়ংকর অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি ‘উজান টিভি’র কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নাহিদ হাসানের ওপর বর্বরোচিত হামলা ও অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনায় তিনি আবারও আলোচনার শিরোনামে এসেছেন।
নাহিদ হাসানের ওপর বর্বরোচিত হামলা
বিনোদনের পাশাপাশি নানামুখী সত্য প্রকাশ ও মানবিক সহায়তা করে থাকেন কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নাহিদ হাসান। সম্প্রতি এক অসহায় বৃদ্ধাকে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে টানা কয়েকদিনের চেষ্টায় অনুদান সংগ্রহ করে তাকে ঢাকায় আনেন তিনি। চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ারে ওই বৃদ্ধাকে নিয়ে গেলে শুরুতে মাসিক ১৮ হাজার টাকা দাবি করে প্রতিষ্ঠানটি। নাহিদ তাতে রাজি হওয়ার পরও তাকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানালে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পুরো ঘটনাটি ফেসবুকে পোস্ট করেন।
এ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়ে ক্ষিপ্ত মিল্টন সমাদ্দার প্রথমে পুলিশি জিডি নিয়ে আসার শর্ত দেন। পরবর্তীতে ফোনে নরম সুরে কথা বলে ডেকে নিলেও তার মূল চেহারা প্রকাশ পায় গভীর রাতে। বুধবার রাত ঠিক ২টা ৩৩ মিনিটে নাহিদ ও তার দুই সঙ্গী সেখানে পৌঁছাতেই ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র কর্মী তাদের ঘিরে ফেলে।
ভয়ংকর নির্যাতনের রাত ও প্রাণনাশের হুমকি
আশ্রমে ঢোকামাত্রই বৈদ্যুতিক বাতি নিভিয়ে তাণ্ডব শুরু হয়। ফেসবুক পোস্টের জেরে তীব্র গালিগালাজ করে মিল্টন নিজে নাহিদের চোখে সজোরে আঘাত করেন। গেঞ্জি টেনে ধরে চড় মারায় তার বুকে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মী দেবাশীষ নাহিদের গলা চেপে ধরেন এবং একই সাথে মারধর করা হয় সঙ্গী ইলিয়াসকেও। নির্মম নির্যাতনের পর প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক আদায় করা হয় অপপ্রচারের ভিডিও স্বীকারোক্তি, যা পরবর্তীতে তাদের পেজে প্রচার করা হতে পারে বলে ভুক্তভোগীরা আশঙ্কা করছেন।
বিপদের আঁচ পেয়ে নাহিদ আগে থেকেই লাইভ লোকেশন শেয়ার এবং মোবাইলে অডিও রেকর্ড চালু রেখেছিলেন। সেখান থেকে কোনোমতে জীবন বাঁচিয়ে বের হয়ে রাতেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চোখের পরীক্ষা ও বুকের এক্স-রে করান তিনি। মারধরের এই ঘটনায় বুধবার বিকালেই সংবাদ সম্মেলন ডেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা দেন নাহিদ।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রিসহ রোমহর্ষক সব অভিযোগ
রক্তাত্ব কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নাহিদ হাসানের ওপর হামলা ছাড়াও মিল্টনের বিরুদ্ধে ব্লেড দিয়ে কেটে কিডনি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি, ৯০০ লাশের মধ্যে ৮৩৫টির দাফনের হিসাব না থাকা এবং জাল ডেথ সার্টিফিকেট তৈরির মতো রোমহর্ষক অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া সাভার ও বরিশালে জমি ও চার্চ দখল, এমনকি জন্মদাতা বাবা-মাকে পেটানোর মতো তথ্যও পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের (১৫ জুলাই) মানবপাচার মামলায় তিনি জামিনে মুক্ত হন।
সাভারে নতুন আস্তানা ও অনুসন্ধানে বাধা
চব্বিশের সোমবার (৫ আগস্ট) সরকার পরিবর্তনের পটভূমিতে মিরপুরের অফিস তড়িঘড়ি করে সাভারের বিরুলিয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়। ‘বাংলা এডিশন’-এর অনুসন্ধানী দল সরেজমিনে সাভারের বিরুলিয়ায় গেলে শুরুতে বাধার মুখে পড়ে এবং ক্যামেরা প্রবেশে সরাসরি নিষেধ জারি করে কর্তৃপক্ষ। কর্তৃপক্ষের দাবি, সব অভিযোগের সমাধান হয়ে গেছে এবং এই বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ কথা বলবেন না। তবে অনুসন্ধানী দল কৌশলে ভেতরে প্রবেশ করে ভেতরের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করলেও কারও সাথে কথা বলার সুযোগ দেয়নি কর্তৃপক্ষ।
আশ্রমের এক সাবেক কেয়ারটেকারের তথ্যমতে, শুরুতে বাসা ভাড়া দিতে হিমশিম খাওয়া মিল্টন রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান। তিনি চিকিৎসকের উপস্থিতি ছাড়াই নিজ হাতে রোগীদের কাটাছেঁড়া করতেন এবং অনেকের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী মিল্টন মুসলমানদের দুঃখ-কষ্ট কখনোই হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেননি এবং তার বেপরোয়া আচরণের কাছে এলাকার সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছিলেন।
পুরো বিষয়ে মিল্টন সমাদ্দারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার এক ভাই ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে তড়িঘড়ি করে লাইন কেটে দেন। মানবিকতার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে অসহায় মানুষদের জিম্মি করে চলা এমন অন্ধকার বাণিজ্য বন্ধে এবং সু শাসনের স্বার্থে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চায় ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষ।
আরও পড়ুন:







