বুধবার

২৬ আগস্ট, ২০২৬ ১১ ভাদ্র, ১৪৩৩

হাসিনার 'নোবেলের লোভ' খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৩৬

আপডেট: ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ১৮:৩৭

শেয়ার

হাসিনার 'নোবেলের লোভ' খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশ
ছবি বাংলা এডিশন

আজ না কাল, কাল না পরশু—এভাবেই অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে কেটে গেল ৯টি বছর। কিন্তু সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার অপেক্ষা যেন শেষ হওয়ার নয়। আজও সেই লাখো রোহিঙ্গার চোখে ভেসে বেড়ায় স্বদেশের ছবি। কিন্তু সেই স্বদেশে ফেরার পথ যেন ক্রমেই আরও দূরে সরে যাচ্ছে।

স্মৃতিতে আজও সেই ২৫ আগস্ট

(২৫ আগস্ট ২০১৭)। মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন ও সহিংসতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে জন্মভূমি ছেড়ে বাংলাদেশে ছুটে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী। স্থলপথ, নৌপথ আর নাফ নদী পেরিয়ে সেদিন সীমান্তে নামে লাখো মানুষের ঢল। আশ্রয়হীন, অসহায়, বাস্তুচ্যুত, গৃহহীন লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে সেদিন আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ।

নোবেলের মোহ ও রাজনৈতিক সমালোচনা

কিন্তু প্রশ্ন দাঁড়ায়—তা কি মানবিকতার অনন্য উদাহরণ ছিল, নাকি এই মানবিকতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল কোনো স্বার্থান্বেষী ব্যক্তির স্বার্থের বেড়াজাল? সমালোচনা রয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকার শেখ হাসিনা নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মোহে পড়েই লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার মতো বড় একটি ঝুঁকি স্বানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নোবেলের সেই সোনার হরিণ ধরা তো দেয়নি; বিপরীতে দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য সৃষ্টি হয়েছে এক অশনিসংকেত।

সে সময় ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা তা আমলে নেননি বলেও দাবি বিশ্লেষকদের অনেকের। উল্টো সাবেক পলাতক প্রধানমন্ত্রী ও তার এমপি-মন্ত্রীরা রোহিঙ্গাদের জন্য বাইরে থেকে আসা নানা অনুদান ও সাহায্য-সহায়তাই আত্মসাৎ করেছেন—এমন অভিযোগও উঠেছে নানা সময়ে।

নতুন সরকার ও প্রত্যাবাসন উদ্যোগ

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় বসলে অনেকেই ভেবেছিলেন, এবার হয়তো রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান হবে। ২০২৫ সালে ড. ইউনূস রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেও এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

জটিল ভূরাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত

বিশেষজ্ঞদের মতে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন শুধু বাংলাদেশ-মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘাত এখনো চলমান। ফলে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের অনেকের। একই সঙ্গে রাখাইনে ভারতের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকায় সংকটটি আরও জটিল হয়ে পড়েছে বলেও অনেকের মত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের ওপর থেকে মনোযোগ কমে যাওয়াও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ধীর করেছে বলেও আলোচনা রয়েছে কূটনৈতিক মহলে।

ক্যাম্পে গণহত্যা দিবস পালন ও দাবিদাওয়া

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের তেমন কোনো উদ্যোগ না দেখা গেলেও তাদের ভেতরে ক্রমেই দেশ ফেরার আশা দীর্ঘ হয়ে চলেছে। (২৫ আগস্ট ২০২৬) রোহিঙ্গাদের কুতুপালং ক্যাম্প-৪, বালুখালী ক্যাম্প-১৯, থাইংখালী ক্যাম্প-১৩ সহ আরও বেশ কয়েকটি ক্যাম্পে বেশ জমকালোভাবে রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস পালন করেন রোহিঙ্গারা। সেখানে তারা আর শরণার্থী জীবন চান না বলে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

এছাড়াও এ দিবস উপলক্ষে হাজার হাজার মানুষকে খেলার মাঠে জড়ো হতে দেখা যায়। সমাবেশে রোহিঙ্গারা পুরুষদের পাশাপাশি রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদেরকেও পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড হাতে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি তুলতেও দেখা যায়। অপরদিকে, স্বদেশে ফেরার জোর দাবি জানিয়ে বক্তব্য প্রদান করতেও অনুষ্ঠানে দেখা যায় রোহিঙ্গা নেতাদের।

রোহিঙ্গা নেতা মৌলভী ছৈয়দ উল্লাহ ছাড়াও রোহিঙ্গা গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মিয়ানমারের পার্লামেন্টে রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান, মিয়ানমারের ট্রানজিট ক্যাম্পে সীমিত সময় রাখা, সকল রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসন করা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিজস্ব সহায়-সম্বল ফেরত দেওয়া, প্রত্যাবাসনের সময় বেঁধে দেওয়া, একসঙ্গে গ্রামের সব মানুষকে প্রত্যাবাসন করা এবং রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসেবে উপস্থাপন না করা—সহ বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

নয় বছর পেরিয়ে গেলেও স্বদেশে ফেরার অনিশ্চয়তা কাটেনি রোহিঙ্গাদের। গণহত্যার বিচার, নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সম্মানজনক প্রত্যাবাসন—এই দাবিই আজ তাদের কণ্ঠে সবচেয়ে জোরালো। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গার প্রশ্ন এখন একটাই—আর কতদিন অপেক্ষা? কবে ফিরবে তারা নিজেদের দেশ মিয়ানমারে?