হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে থামছে না স্বর্ণ চোরাচালান। কাস্টমস ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে পাচারের পথ ও কৌশল। কখনো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো হোল্ড, কখনো ফলের ক্যারেট, বিমানের টয়লেট কিংবা যাত্রীর শরীরে লুকিয়ে আনা হচ্ছে স্বর্ণ। গত পাঁচ বছরে এই বিমানবন্দর থেকে প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ হলেও চোরাচালানচক্রের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত শতাধিক অভিযানে প্রায় ২ হাজার কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণবার ও অলংকার থেকে ২ হাজার ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় হয়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৬৯৭ কেজি, ২০২২-২৩ সালে ৫৫৪ কেজি, ২০২৩-২৪ সালে ৪১৭ কেজি, ২০২৪-২৫ সালে ১৬৮ কেজি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৭০ কেজির কিছু বেশি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে।
বিমানবন্দর থানার তথ্য বলছে, গত পাঁচ বছরে স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে ৫৪১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১ সালে ১১৪টি, ২০২২ সালে ১৩৫টি, ২০২৩ সালে ১১২টি, ২০২৪ সালে ৮৪টি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯২টি মামলা হয়েছে।
বদলাচ্ছে পাচারের কৌশল
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, স্বর্ণ পাচারে অর্ধশতাধিক কৌশল ব্যবহার করছে চক্রটি। কখনো যাত্রী, আবার কখনো বিমান-সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, বৈদ্যুতিক মোটর, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতল, মানিব্যাগ, সাউন্ড বক্সের অ্যাডাপ্টার, ওষুধের পাত্র, কোমরের বেল্ট, জুতা, শার্টের কলার, হুইলচেয়ার ও লকেটে লুকিয়েও স্বর্ণ আনার ঘটনা ধরা পড়েছে।
বিভিন্ন সময় কেবিন ক্রু, পাইলট, প্রকৌশলী, ট্রলিম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও স্বর্ণ পাচারে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সময় মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী অন্তত এক ডজন বাংলাদেশি এই চোরাচালানচক্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। চোরাচালানে মূল হোতাদের সহযোগী হিসেবে সিভিল অ্যাভিয়েশন, কাস্টমস, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ইউনিট, পুলিশ ও আনসারের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নামও এসেছে।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এসএম রাগিব সামাদ বলেন, বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। নজরদারির কারণেই স্বর্ণের চালানগুলো ধরা পড়ছে। সিন্ডিকেট ও চোরাকারবারিদের ঠেকাতে নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, বিমানবন্দরের ভেতরে কোনো না কোনো পর্যায়ে সংঘবদ্ধ সহযোগিতা রয়েছে। শুধু বাহককে আটক করে এ অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়; পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মতে, কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, নিরাপত্তা ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক স্ক্যানিং, ঝুঁকিভিত্তিক তল্লাশি এবং কর্মকর্তাদের নিয়মিত রোটেশন জরুরি।
দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটেও হাতবদল
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি দুবাই-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটের ফ্লাইট ব্যবহার করেও স্বর্ণ পাচার করা হচ্ছে। দুবাই থেকে আসা একজন বাহক বিমানে স্বর্ণ নিয়ে ওঠেন। চট্টগ্রামে যাত্রাবিরতির সময় চক্রের আরেক সদস্য একই ফ্লাইটে ওঠেন। পরে আকাশপথেই স্বর্ণ তার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
শাহজালালে নেমে দুবাই থেকে আসা যাত্রী আন্তর্জাতিক টার্মিনাল দিয়ে বেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রাম থেকে ওঠা সদস্য স্বর্ণসহ অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ব্যবহার করে বিমানবন্দর ত্যাগ করেন।
এক কর্মকর্তা জানান, অভ্যন্তরীণ আগমনী টার্মিনালে নিয়মিত কাস্টমস তল্লাশি না থাকায় এ কৌশলে স্বর্ণ পাচার তুলনামূলক সহজ। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছাড়া বাহক শনাক্ত করাও কঠিন।
চলতি বছরে তিন বড় চালান
চলতি বছর শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বর্ণের তিনটি বড় চালান ধরা পড়েছে। ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটের প্যানেল থেকে ১৫৩টি স্বর্ণবার উদ্ধার করা হয়। এসব স্বর্ণের ওজন ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম এবং বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। এ ঘটনায় বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এরপর ২ জুলাই দুবাই থেকে আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের কার্গো হোল্ড থেকে ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় মামলা হলেও কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি।
গত ১৯ জুলাই হংকং হয়ে আসা ক্যাথে প্যাসিফিকের কার্গো ফ্লাইটে রামবুটান, চেরি ও অ্যাভোকাডোভর্তি ক্যারেট থেকে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
ঢাকা কাস্টম হাউসের কর্মকর্তারা জানান, চোরাচালান প্রতিরোধে নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিমানবন্দর এলাকায় সাম্প্রতিক অভিযানেও স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা ঘটছে। ১০ আগস্ট বিমানবন্দরের বাইরের গোলচত্বর এলাকায় একটি পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে ১ কেজি ৮১২ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়।
অধরা মূল হোতারা
গোয়েন্দা ও পুলিশ সূত্রের দাবি, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক চক্রে অর্ধশতাধিক বড় চোরাকারবারি এবং দুই শতাধিক মাঝারি পর্যায়ের কারবারি সক্রিয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করেই স্বর্ণ চোরাচালান নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।
তারা নিজ নিজ এলাকায় চক্র গড়ে তুলে চোরাই স্বর্ণ স্থানীয় জুয়েলারি দোকানে বিক্রি করছেন। আবার একটি অংশ বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে প্রতিবেশী দেশেও পাচার করছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি বিভিন্ন সময় উঠলেও অভিযোগের পর সাময়িক বরখাস্ত বা বদলির ঘটনা ঘটেছে। স্থায়ীভাবে চাকরি হারানোর ঘটনা খুবই কম।
বিমানবন্দরের ব্যাগেজ রুল অনুযায়ী, একজন যাত্রী বিদেশ থেকে আসার সময় ঘোষণা দিয়ে এক বছরে মোট ১০০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণালংকার শুল্ক পরিশোধ ছাড়া নিয়ে আসতে পারেন। অন্যদিকে একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ তোলা স্বর্ণবার বা স্বর্ণপিণ্ড আনতে পারেন। প্রতি ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম স্বর্ণবারের জন্য ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর ধরা হয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, স্বর্ণ চোরাচালানের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্রটি হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে বেছে নিয়েছে। ঢাকায় নজরদারি জোরদার হলে তারা রুট পরিবর্তন করে। অধিকাংশ চালান আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে। এ ছাড়া সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটও চোরাচালানে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে অনেক সময়ই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে কর্তব্যরত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে শুধু সাময়িক বরখাস্ত বা বদলি করা হয়। কিছুদিন পর তারা আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসেন। এর চেয়ে বড় শাস্তির ঘটনা খুবই কম।
এ বিষয়ে বিমানের জনসংযোগ মহাব্যবস্থাপক মহিউদ্দিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি তথ্যপ্রাপ্তির আবেদনপত্রে আবেদন করতে বলেন। পরে আবেদন করলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কাছ থেকে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি বারবার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার কামরুল হাসান বলেন, বিধিবহির্ভূতভাবে এই স্বর্ণগুলো নিয়ে আসেন যাত্রী ও চোরাচালানি চক্র। চোরাচালান প্রতিরোধে কাস্টমস নজরদারিসহ বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিনা শুল্কে কোনো স্বর্ণ যেন পাচার না হতে পারে, সেজন্য বিমানবন্দরে সার্বক্ষণিক নজরদারি রয়েছে এবং সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।
বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, স্বর্ণ চোরাচালানে মূল হোতা কারা, তা জানতে পুলিশ কাজ করছে। বিশেষ করে দুবাই রুটে রাঘব বোয়াল কারা, সেটি বের করার চেষ্টা চলছে। খুব শিগগির পুরো চক্রের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
আরও পড়ুন:







