সাত বছর আগে যে রায় কাঁপিয়ে দিয়েছিল পুরো দেশকে, আজ সেই মামলার আপিল রায়ে আদালতের টেবিলে উল্টে গেল সব হিসাব! ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাত হত্যা মামলায় ১৬ আসামির মধ্যে ১০ জনকেই খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। এই একটি রায়ের পরই সামনে এল এমন এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, যা পুরো ঘটনার মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দিয়েছে।
ইলিয়াস হোসাইনের দাবি: হত্যাকাণ্ড নয়, আত্মহত্যা
অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন তার সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তা এবং তার করা বহুল আলোচিত ফিফটিন মিনিটসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছেন, এটি আদতে কোনো হত্যাকাণ্ডই ছিল না, বরং নিখুঁতভাবে সাজানো এক আত্মহত্যার ছক।
নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে বড় পরিবর্তনের পর, ঘটনাটি নিয়ে কথা বলেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন। এক ভিডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, ঘটনাটি কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, বরং স্রেফ একটি আত্মহত্যার ঘটনা।
ইলিয়াস হোসাইনের এই দাবির প্রমাণ মেলে তার ২০১৯ সালের সেই ফিফটিন মিনিটসের চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। যেখানে তথ্য-প্রমাণসহ দেখানো হয়েছিল আত্মহত্যার এই নিখুঁত ছক।
কেন আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন নুসরাত? সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। জানা যায়, প্রেমিক মিন্টুর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পরবর্তীতে সাব-ইন্সপেক্টর শরীফসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে চরম হতাশায় ভুগছিল মেয়েটি।
মূলত ছেলেদের সাথে মেলামেশার কারণে অধ্যক্ষ তাকে বহিষ্কার করলে প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে তিন বান্ধবী মিলে ইভটিজিংয়ের নাটক সাজায়। পরবর্তীতে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে গায়ে আগুন লাগানোর ঘটনাটি ছিল তারই অংশ, যার তিনদিন আগেও সে আত্মহননের চেষ্টা করেছিল।
বনজ কুমার ও সময় টিভির ভূমিকা
একটি আত্মঘাতী ঘটনাকে পরিকল্পিত খুনের রূপ দেওয়ার নেপথ্যে আঙুল ওঠে সোজা তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের দিকে।
আর ভিডিও বার্তায় এই ঘটনার নেপথ্যে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গভীর ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরে ইলিয়াস হোসাইন এর সাথে সরাসরি ভারতের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন।
তার দাবি, মাদ্রাসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন পিবিআই প্রধান বনজ কুমার ও ওসি শাহ আলমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে টার্গেট করেছিল ভারত।
নিজের খেয়ালখুশিমতো গল্প ফেঁদে সত্য ধামাচাপা দিতে গায়েব করা হয় আশপাশের প্রায় ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ। এমনকি তিনদিন পর্যন্ত গোপন রাখা হয় নিহতের মূল 'ডাইং ডিক্লারেশন'।
তথ্য গোপনের পাশাপাশি নিরীহ আসামিদের পরিবারকে ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয় বিপুল পরিমাণ অর্থ।
ভয়াবহ এই নাটকের আড়ালে চলা কোটি টাকার চাঁদাবাজির প্রমাণ মেলে ১৫ মিনিটের সেই অনুসন্ধানেও। রিমান্ড থেকে বাঁচানো ও মামলার চার্জশিট থেকে নাম কাটার প্রলোভনে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি এবং মাকসুদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উঠে আসে।
শুধু চাঁদাবাজি নয়, নিরীহ মানুষদের ফাঁসাতে রিমান্ডে চালানো হয় পৈশাচিক নির্যাতন। বাদ যাননি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কামরুন্নাহার মনিও। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ায় গর্ভের সন্তান নষ্টের হুমকি দিয়ে আদায় করা হয় মিথ্যা জবানবন্দি। অন্যদিকে, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শামীমের মোবাইল লোকেশন বলছে, ঘটনার দিন সকালে সে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৫ মাইল দূরে ছিল।
মাদ্রাসার দপ্তরি নুরুল আমিনকে ভয় দেখিয়ে ৪ নম্বর সাক্ষী বানানো হয়। তার ফাঁস হওয়া কল রেকর্ড ও বক্তব্যে প্রমাণ মেলে, পুকুর থেকে বোরকা উদ্ধারের নাটকটি তদন্তকারী কর্মকর্তা অজিতেরই সাজানো; যিনি পরবর্তীতে নিজেই গাড়ি চাপা পড়ে মারা যান।
অন্যদিকে শিক্ষক আফসার উদ্দিন, যিনি আত্মহত্যার আগাম এসএমএস নিয়ে পিবিআইয়ের কাছে গিয়েছিলেন, তাকেই বানানো হয় ৮ নম্বর আসামি।
পুরো হত্যাকাণ্ডটি সাজানোর পেছনে সময় টেলিভিশনসহ অন্যান্য গণমাধ্যমের দায় দেখছেন ইলিয়াস হোসাইন। সময় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মূল কারিগর বা পরিকল্পনাকারী ছিলেন ওমর ফারুক। অভিযোগ রয়েছে, বনজ কুমারের সরবরাহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ফারুক একটি বিশদ 'চিত্রনাট্য' বা সাজানো ছক তৈরি করেন। পরবর্তীতে সেই সাজানো গল্পকেই একটি বাস্তব হত্যাকাণ্ড হিসেবে রূপ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই সাজানো নাটকে প্রভাবশালী একটি সাংবাদিক চক্রও ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল বলে ভিডিও বার্তায় দাবি করা হয়।
সময় টিভির ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয় কিভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার ইন্ধনে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যার মূল পরিকল্পনা ও কিলিং মিশন।
মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও সেসময় কোনো সত্য না খুঁজে প্রচার করেছিল শেখানো বুলি। বনজ কুমারের স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী গণমাধ্যমে একপেশে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল ব্যারিস্টার সুমন এবং ওসি মোয়াজ্জেমকেও। প্রশ্ন তোলা হয় নুসরাতের বিচারক এবং আইনজীবীদের একাংশের ভূমিকা নিয়েও।
সত্য বলায় ফাঁসানো হয়েছিল তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেমকে। ব্যারিস্টার সুমনের যোগসাজশে তাকে জেলে পাঠানো হয়।
অথচ দাড়ি-টুপি রাখায় চাকরি হারানো পুলিশ কনস্টেবল নাজমুল তারেক সুমনের কাছে আইনি সহায়তা চাইতে গেলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।
পরিবারের অবস্থা ও কৃতজ্ঞতা
একদিকে যখন ১৬টি পরিবার পথে বসেছে, তখন নুসরাতের মায়ের কান্নাকাটিকে সম্পূর্ণ সাজানো নাটক হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এই অনুসন্ধানী সাংবাদিক।
হাইকোর্টের রায়ে আংশিক সত্যের বিজয় হলেও, ফাঁসির সেলে নিরপরাধ মানুষগুলোর হারিয়ে যাওয়া জীবনের হিসাব অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
ভিডিও বার্তায় বর্তমান আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আসামী পক্ষের আইনজীবীদের ভূমিকার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। একইসাথে দাবি করেন জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির।
আদালতের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন আসামিপক্ষের স্বজনরা। ন্যায়বিচার পাওয়ায় তারা ফিফটিন মিনিটসে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
সাত বছর পর হাইকোর্টের রায়ে যখন মৃত্যুদণ্ডে বড় পরিবর্তন এলো, তখন আবারও জোরেশোরে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এই ১৬ জন মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিল পিবিআই? কার স্বার্থে সাজানো হয়েছিল আত্মহত্যার এই নির্মম খুনের নাটক? সেই উত্তরগুলো এখন সময়ের দাবি।
আরও পড়ুন:







