ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলা। দীর্ঘ সাত বছর পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানালেন হাইকোর্ট। সোমবার দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার বেঞ্চ নিম্ন আদালতের দেয়া ১৬ জনের ফাঁসির আদেশে আনেন বড় ধরনের পরিবর্তন।
ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
আর এই রায়ের পরই নতুন করে সামনে এসেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের ২০১৯ সালের একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। যেখানে তথ্য-প্রমাণসহ দাবি করা হয়, ঘটনাটি কোনো হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং এটি ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো এক আত্মহত্যার ছক।
অনুসন্ধানী ওই প্রতিবেদনে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। নুসরাতের প্রেমিক মিন্টুর সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পরবর্তীতে সাব-ইন্সপেক্টর শরীফসহ একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ব্যর্থ হয়ে চরম হতাশায় ভুগছিল মেয়েটি। শরীফের সাথে আদান-প্রদান করা ১৮টি গোপন এসএমএস-এর প্রমাণও মেলে। যেখানে নুসরাত লিখেছিল, 'সিরাজুদ্দৌলাকে শাস্তি দিতে পারলে আপনি যা চাইবেন আমি তাই দেবো।'
ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, মূলত ছেলেদের সাথে মেলামেশার কারণে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদদৌলা নুসরাতকে বহিষ্কার করলে, প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হন তিনি। তিন বান্ধবী মিলে সাজায় ইভটিজিংয়ের নাটক। যারই ধারাবাহিকতায় ৬ এপ্রিল সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে গায়ে আগুন লাগানোর ঘটনাটি ছিল আত্মহননেরই একটি অংশ, যার তিনদিন আগেও সে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল। তাই প্রশ্ন রয়ে যায়, একটি আত্মঘাতী ঘটনাকে কে বা কারা বানিয়েছে পরিকল্পিত খুন?
তদন্ত ও অভিযোগ
অনুসন্ধানের আঙুল সোজা সাবেক পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের দিকে।
অভিযোগ রয়েছে, নিজের খেয়ালখুশিমতো গল্প ফেঁদেছেন এই কর্মকর্তা। সত্য ধামাচাপা দিতে গায়েব করা হয় আশপাশের প্রায় ১০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ। এমনকি তিনদিন পর্যন্ত গোপন রাখা হয় নিহতের মূল 'ডাইং ডিক্লারেশন'।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিরীহ মানুষদের ফাঁসাতে রিমান্ডে চালানো হয় এমন পৈশাচিক নির্যাতন। বাদ যাননি ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কামরুন্নাহার মনিও। বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেয়ায় গর্ভের সন্তান নষ্টের হুমকি দিয়ে আদায় করা হয় মিথ্যা জবানবন্দি। অন্যদিকে, ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত শামীমের মোবাইল লোকেশন বলছে, ঘটনার দিন সকালে তিনি ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ৫ মাইল দূরে ছিলেন।
ইলিয়াস হোসাইনের দাবি, ভয়াবহ এই নাটকের আড়ালে চলেছে কোটি টাকার চাঁদাবাজি। রিমান্ড থেকে বাঁচানো ও মামলার চার্জশিট থেকে নাম কাটার প্রলোভনে উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতা রুহুল আমিনের কাছ থেকে প্রায় ৪ কোটি এবং মাকসুদের কাছ থেকে ৩৯ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উঠে আসে অনুসন্ধানে।
মাদ্রাসার দপ্তরি নুরুল আমিনকে ভয় দেখিয়ে ৪ নম্বর সাক্ষী বানানো হয়। তার ফাঁস হওয়া কল রেকর্ড ও বক্তব্যে প্রমাণ মেলে, পুকুর থেকে বোরকা উদ্ধারের নাটকটি তদন্তকারী কর্মকর্তা অজিতেরই সাজানো; যিনি পরবর্তীতে নিজেই গাড়ি চাপা পড়ে মারা যান।
সত্য বলায় ফাঁসানো হয়েছিল তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেমকেও। ঘটনাটিকে প্রথম থেকেই 'আত্মহত্যা' বলায়, আওয়ামী দালালখ্যাত ব্যারিস্টার সুমনের যোগসাজশে মোয়াজ্জেমকে জেলে পাঠানো হয়। অথচ দাড়ি-টুপি রাখায় চাকরি হারানো পুলিশ কনস্টেবল, নাজমুল তারেক সুমনের কাছে আইনি সহায়তা চাইতে গেলে তাকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।
অন্যদিকে শিক্ষক আফসার উদ্দিন, যিনি আত্মহত্যার আগাম এসএমএস নিয়ে পিবিআইয়ের কাছে গিয়েছিলেন, তাকেই বানানো হয় ৮ নম্বর আসামি। আর সেসময় মূলধারার গণমাধ্যমগুলোও কোনো সত্য না খুঁজে প্রচার করেছিল শেখানো বুলি।
রায়ের পর প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়া
সাত বছর পর হাইকোর্টের রায়ে যখন মৃত্যুদণ্ডে বড় পরিবর্তন এলো, তখন আবারও জোরেশোরে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি হাসিনার সরকারের ইশারায় ১৬ জন মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছিল পিবিআইয়ের তখনকার দায়িত্বপ্রাপ্তরা?
আদালতের এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে আসামিপক্ষের স্বজনরা। ন্যায়বিচার পাওয়ায় তারা অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান।
এছাড়া, ফেনীর আলোচিত নুসরাত মামলা সংক্রান্ত রায় ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ঘিরে নেটদুনিয়ায় সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের পোস্ট নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
দেলোয়ার বাঙালি নামের একজনের পোস্টে দাবি করা হয়, তৎকালীন সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৈরি করা নথির বিপরীতে প্রবাস থেকে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমেই মামলার পটভূমি বদলে দিয়েছিলেন ইলিয়াস হোসাইন। তাঁর প্রকাশিত তথ্যের কারণেই ১৬ জন আসামির একতরফা ফাঁসির আদেশ আটকে যায় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় সত্য উন্মোচিত হয়।
নিরপরাধ মানুষের জীবন রক্ষায় সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের ভূমিকার প্রশংসা করার পাশাপাশি তৎকালীন সময়ে, তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার বা বাতিলের আহ্বান জানান এই ব্যবহারকারী।
একটি আত্মহত্যাকে, হত্যা হিসেবে চালিয়ে দিয়ে নিরাপরাধ আলেমদের ফাঁসানো হয়েছে, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের এই দাবিই যেন সত্য প্রমাণ হলো অনেক বছর পরে, এমন আলোচনাই চলছে চারদিকে।
আরও পড়ুন:








