বিষ মানেই সাপের ফণা নয়। বিষ কখনো আসে নিঃশব্দে, কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই। কখনো সকালের নাশতার পাউরুটিতে, কখনো প্রিয় মিষ্টির রঙিন আবরণে, আবার কখনো প্রতিদিনের খাবারের অগোচরে মিশে যায় তার অদৃশ্য বিষাক্ততা। এমনকি প্রতিটি নিঃশ্বাসের সঙ্গেও অজান্তে শরীরে ঢুকে পড়ে ক্ষতিকর কণা।
এই নীরব বিষের ছোবল যেন ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দেশের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। ক্যানসার, কিডনি, লিভার, হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের প্রতিদিনের খাবার, নিত্যব্যবহার্য পণ্য এবং চারপাশের দূষিত পরিবেশের কারণে দিন দিন পঙ্গপালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যে বলা হয়েছে, অনিরাপদ খাবার ও খাদ্যদূষণের কারণে মানবদেহে সৃষ্টি হতে পারে ২০০টিরও বেশি রোগ। খাদ্যে ভেজালের কারণে কলেরা, সালমোনেলোসিস, হেপাটাইটিস ও বটুলিজমের মতো রোগ থেকে শুরু করে ক্যানসার পর্যন্ত নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
মাছ, শাকসবজি, ফলমূল, গুঁড়া মসলা, মাংস, দুধ, চাল ও ডাল, প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় থাকা এসব পণ্যে বিভিন্ন সময়ে ফরমালিন, সিসা, আর্সেনিক, পারদ, ক্যাডমিয়াম, কীটনাশকসহ নানা ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির তথ্যও সামনে এসেছে।
ব্রয়লার মুরগিতে অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ
তবে উদ্বেগ যেন থামছে না এখানেই। মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের খাবারের টেবিলে তুলনামূলক সহজলভ্য ও শেষ ভরসার একটি খাবার ব্রয়লার মুরগি নিয়েও সামনে এসেছে আশঙ্কাজনক তথ্য।
জানা গেছে, বিষাক্ত অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ থাকার পরও বাজারে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার মুরগি। দীর্ঘদিন এমন মাংস খেলে মানবদেহে তৈরি হতে পারে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নানান জটিলতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সঙ্গে ক্যানসারের আশঙ্কাও রয়েছে।
শুধু মাংস নয়, বিষাক্ততার আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়েছে ফলমূল ও শাকসবজিতেও। এসব খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার যেমন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, তেমনি কেক ও জিলাপিতে অনিরাপদ রং ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, দীর্ঘদিন এসব উপাদান গ্রহণ করলে কিডনি ও লিভারে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
পাউরুটিতে পটাশিয়াম ব্রোমেট
অসুস্থ ও জ্বরাক্রান্ত রোগীদের জন্য পাউরুটি অনেক সময় হয়ে ওঠে সহজলভ্য খাবারের অন্যতম অবলম্বন। কিন্তু সেই পাউরুটিই পাওয়া যাচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি। ২০২১ সালের একটি তথ্য সেই প্রশ্নকেই আরও জোরালো করে তোলে। তথ্য বলছে, ঢাকার বাজারের ১৯টি পাউরুটির মধ্যে ১৬টিতেই অর্থাৎ প্রায় ৮৪ শতাংশ পাউরুটিতে অতিরিক্ত পটাশিয়াম ব্রোমেটের উপস্থিতি পাওয়া যায়। সেখানে এর মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৩১ থেকে ১২ দশমিক ৯১ পিপিএম পর্যন্ত।
জিলাপিতে হাইড্রোজের ব্যবহার
অন্যদিকে, মানুষের অত্যন্ত পছন্দের খাবারের তালিকায় থাকা জিলাপিও যেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর হাতে হয়ে উঠেছে আরেক স্বাস্থ্যফাঁদ। অভিযোগ রয়েছে, জিলাপিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে এবং দীর্ঘ সময় মুচমুচে রাখতে হাইড্রোজ নামের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এই উপাদানের প্রভাবে কিডনির মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন এলাকায় আইন-কানুন না মেনে অপরিকল্পিতভাবে বেকারিতে পাউরুটি তৈরির অভিযোগও কম নয়। ফলে খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে ক্ষতিকর উপাদান ঢোকার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক
শুধু খাবারেই নয়, দেশের টুথপেস্ট নিয়েও গবেষণায় সামনে এসেছে আরও মারাত্মক তথ্য। সম্প্রতি পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এবং এর কারণে ক্যানসারসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কার কথাও জানায় বিশেষজ্ঞরা।
ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জব্বার মন্ডল বাংলা এডিশনকে বলেন, খাদ্যে ভেজাল মেশানো অসাধু চক্রের বিরুদ্ধে যেমন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।
লাভের অঙ্ক বাড়াতে গিয়ে যেখানে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা উপেক্ষিত হচ্ছে, সেখানে সাধারণ মানুষের ক্ষোভও ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো এসব চক্রের বিরুদ্ধে বাড়ছে চরম অসন্তোষ।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে হলে খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি, সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে তারা।
আরও পড়ুন:








