সোমবার

২৪ আগস্ট, ২০২৬ ৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

সাত মাসে ধর্ষণের পর হত্যা বেড়েছে ৮১ শতাংশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট, ২০২৬ ০৮:৪৯

শেয়ার

সাত মাসে ধর্ষণের পর হত্যা বেড়েছে ৮১ শতাংশ
ছবি সংগৃহীত

গত বছর পুরো ১২ মাসে ৫৫ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হলেও চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮ জনে। মাসিক গড় হিসাবে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বেড়েছে ৮১ শতাংশ। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য থেকে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ ২৪ আগস্ট পালিত হচ্ছে ইয়াসমিন হত্যা দিবস, যা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবেও পরিচিত।

১৯৯৫ সালের এই দিনে দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিন পুলিশ সদস্যদের দ্বারা গণধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের আন্দোলনে দিনাজপুরে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহত হন। পরবর্তীতে ওই আন্দোলন দেশব্যাপী নারী অধিকার আন্দোলনের রূপ নেয়। এরপর থেকে দিনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

ঘটনার ৩১ বছর পার হলেও নারী ও শিশুদের ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা বন্ধ হয়নি।

সম্প্রতি মাদারীপুরের শিবচরে ২৮ বছর বয়সী এক নারীকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে ফারুক নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে ফারুক স্বীকার করেন, ধর্ষণের পর ওই নারীকে হত্যা করে তার মরদেহ ঝোপের পাশে ফেলে রাখেন তিনি। তার এক বছর বয়সী শিশুপুত্রকেও আড়িয়াল খাঁ নদীতে ফেলে হত্যার কথা স্বীকার করেন ফারুক।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, অপরাধের প্রমাণ মুছে ফেলা, ভুক্তভোগীকে চুপ করিয়ে দেওয়া কিংবা পরিচয় প্রকাশের ভয় থেকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এত নৃশংস ঘটনা দেখে তারাও ট্রমাটাইজ হয়ে পড়েন। তার মতে, সমাজের অস্থিরতা, মাদকের প্রসার এবং বিচার না হওয়া এসব ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ।

ধর্ষণের পর হত্যার পরিসংখ্যান

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭৪৯টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এর মধ্যে ৫৬৯টি ছিল একক ধর্ষণ এবং ১৮০টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা।

গত পাঁচ বছরে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে ২০২টি। আশঙ্কার বিষয় হলো, এর একটি বড় অংশ শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হচ্ছে। মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, গত সাত মাসে ১০ জন নারী ও ২১ জন শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে।

ধর্ষণের পর হত্যার সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ছিল চলতি বছরের মার্চে মিরপুরে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যা। এছাড়া গত বছর মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে তার বোনের শ্বশুর ধর্ষণ ও হত্যা করেন। দুটি ঘটনাই দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে।

আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোটের প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা দূর করতে হবে। হাইকোর্টে মামলা এলে সাধারণ মানুষ আর মামলার হদিস করতে পারেন না।

তিনি নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ১৮০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জিনাত আরা হক বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না; বাস্তবে ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। নির্ভুল আলামত সংগ্রহ, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ধর্ষণবিরোধী আইন যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্ব ভুক্তভোগীকেই বহন করতে হয়। ফলে পুলিশ থেকে চিকিৎসক পর্যন্ত প্রত্যেকের সহযোগিতা না পেলে বিচারপ্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।

তিনি বলেন, নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো পক্ষপাতদুষ্ট। বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও অনেক ক্ষেত্রে এর ঊর্ধ্বে নন। নারীবিদ্বেষী গোষ্ঠী এ দেশে প্রশ্রয়প্রাপ্ত এবং অত্যন্ত সক্রিয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষক ভুক্তভোগীর তুলনায় সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে বেশি ক্ষমতাধর অবস্থানে থাকেন। ফলে যে সমাজে বিচারব্যবস্থা নিরপেক্ষ ও নারীবান্ধব নয়, সেখানে ধর্ষণের বিচার পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং আইন কমিশনের মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তা ফউজুল আজিম মনে করেন, ধর্ষণের পর হত্যা বন্ধে প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযোগ গ্রহণ, দ্রুত মেডিক্যাল পরীক্ষা, ডিএনএ ও অন্যান্য ফরেনসিক আলামত সংরক্ষণ, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং শিশুদের জন্য সহায়ক জিজ্ঞাসাবাদ ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, মামলার যতটুকু সময় প্রয়োজন, ততটুকু সময় নিয়ে তা নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজে যৌন সহিংসতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

শিশুদের নিরাপদ ও অনিরাপদ আচরণ সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। কোথাও যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে তা গোপন না করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।



banner close
banner close