শনিবার

২২ আগস্ট, ২০২৬ ৭ ভাদ্র, ১৪৩৩

বিমানের কেবিন ক্রুদের বিরুদ্ধে হুন্ডির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২ আগস্ট, ২০২৬ ০৭:২৭

শেয়ার

বিমানের কেবিন ক্রুদের বিরুদ্ধে হুন্ডির অভিযোগ
ছবি বাংলা এডিশন

জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের একটি অংশের বিরুদ্ধে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার ও হুন্ডি লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। দুবাই স্টেশনে প্রচলিত নিয়ম অমান্য করে একাধিক কেবিন ক্রুর ওভারসিজ ভাতা একজনের নামে উত্তোলন এবং পরে সেই অর্থ হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তরের তথ্য উঠে এসেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), ডিজিএফআই ও বিমানের অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে কর্মরত বিমানের প্রত্যেক কেবিন ক্রুর ওভারসিজ বা বহির্গমন ভাতা সংশ্লিষ্ট দেশে নিজ নিজ নামে ব্যাংক থেকে উত্তোলনের বিধান রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং হুন্ডি বা অবৈধ অর্থ পাচারের সুযোগ বন্ধ করা। তবে দুবাই স্টেশনে এ নিয়ম অনুসরণ না করে বহু ক্রুর অর্থ একসঙ্গে উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত ১৪ মে জনতা ব্যাংক পিএলসি, দুবাই শাখা থেকে একটি চেকের মাধ্যমে ১৯৬ জন কেবিন ক্রুর বকেয়া ও ওভারসিজ ভাতা বাবদ ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। চেকটি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ইমপ্রেস্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ফ্লাইট স্টুয়ার্ড এফএস শাকুরের নামে ইস্যু করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, বিমানের অর্থ বিভাগের তৎকালীন এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রচলিত পদ্ধতি উপেক্ষা করে একজনের নামে সম্মিলিত অর্থ উত্তোলনের অনুমোদন দেন। দুবাই স্টেশনের ফাইন্যান্স ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিপুল পরিমাণ অর্থ উত্তোলনের পর তা সংশ্লিষ্ট ক্রুদের হাতে না দিয়ে দুবাইয়ে রেখে দেওয়া হয়। একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উত্তোলিত অর্থের একটি অংশ দুবাইয়ে অবস্থানরত একজন হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ ঘটনায় কেবিন ক্রু ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত এফএস শাকুরের নাম সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার উত্তরার একটি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট নাজমুলের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে জড়িত তিনি। দুবাইয়ে উত্তোলিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বাংলাদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যে ওই চক্রকে ব্যবহার করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দুবাইয়ে অর্থ হস্তান্তরের তথ্য পাওয়ার পর গত ১৫ মে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়। সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে বিজি-২৪৮ নম্বর ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরেন এফএস শাকুর। গ্রিন চ্যানেল অতিক্রমের সময় ডিজিএফআই ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে আটক করে তল্লাশি চালান।

এ সময় শাকুরের কাছে ১০ হাজার মার্কিন ডলার ও ২ হাজার দুবাই দিরহাম পাওয়া যায়। তার সঙ্গে থাকা অন্য ক্রুদের কাছ থেকেও কিছু বৈদেশিক মুদ্রা উদ্ধার করা হয়, যার পরিমাণ প্রায় ৭৮ হাজার ৩৬০ দিরহাম সমপরিমাণ।

তবে ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৪৭ দিরহাম উত্তোলনের বিপরীতে এত অল্প পরিমাণ অর্থ পাওয়ায় প্রশ্ন ওঠে। প্রথমে বাকি প্রায় ১২ লাখ ৬৮ হাজার ৪৮৭ দিরহামের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি শাকুর। পরে তিনি ওই অর্থ দুবাইয়ে অবস্থানরত এক হুন্ডি এজেন্টের কাছে হস্তান্তরের কথা স্বীকার করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ওই অর্থ ঢাকার উত্তরায় পূর্বনির্ধারিত স্থানে জমা দেওয়ার মাধ্যমে দেশে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলেও জানা গেছে।

বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে গত দুই বছরের কার্যক্রমের তথ্যও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এফএস শাকুর ছাড়াও আবু সালেহ, অংকুর, শফিউল্লাহসহ আরও কয়েকজন কেবিন ক্রু এই সিন্ডিকেটে জড়িত। অভিযোগ অনুযায়ী, তারা নিয়মিতভাবে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটের ফ্লাইটের শিডিউল পেতেন। মাসিক আউট-স্টেশন ভাতা প্রস্তুতের সময় শিডিউলিং বিভাগ থেকে কৌশলে তাদের নাম সুবিধাজনক ফ্লাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হতো।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই বছরে এই চারজন অথরিটি বিলের মাধ্যমে আনুমানিক ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। এর সিংহভাগ অর্থ লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে এফএস শাকুর বলেন, তার পেছনে অনেকেই লেগেছেন এবং তারা তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এর আগে গত ২২ এপ্রিলও একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। ওই দিন ১৬০ জন কেবিন ক্রুর ওভারসিজ অ্যালাউন্স বাবদ প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার দিরহাম একটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। বিলশিট প্রস্তুত করা হয়েছিল বাংলাদেশ বিমান কেবিন ক্রু ইউনিয়নের নামে এবং চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল ফ্লাইট স্টুয়ার্ড ইফতেখার আলমের নামে।

অভিযোগ রয়েছে, এভাবে বহু ক্রুর বিল একত্র করে একজনের নামে অর্থ উত্তোলনের পর তা হুন্ডির মাধ্যমে দেশে আনা এবং পরে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের কেবিন ক্রুদের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা পাচার বা হুন্ডির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। সংঘবদ্ধ চক্রের সঙ্গে কারা জড়িত, কীভাবে অর্থ সংগ্রহ ও হস্তান্তর হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ কোনো সহযোগিতা ছিল কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক হাব থেকে বড় অঙ্কের অর্থ হাতবদলের অভিযোগ থাকলে পুরো আর্থিক লেনদেনের চেইন অনুসন্ধান জরুরি।

বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম বলেন, এ ঘটনায় কারা জড়িত, তদন্তের মাধ্যমে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়ম বা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটি একদিনের বা একক ব্যক্তির ঘটনা নয়। গত প্রায় দুই বছরে কেবিন ক্রুদের একটি প্রভাবশালী অংশ নিয়মিতভাবে দুবাই, আবুধাবি ও শারজাহ রুটের ফ্লাইটে নিজেদের শিডিউল নিশ্চিত করার সুযোগ নিয়েছে।



banner close
banner close