শুক্রবার

২১ আগস্ট, ২০২৬ ৬ ভাদ্র, ১৪৩৩

মানবিক সুযোগে দিপু মনিদের অপরাধ স্বাভাবিকীকরণের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট, ২০২৬ ১৪:৪৫

শেয়ার

মানবিক সুযোগে দিপু মনিদের অপরাধ স্বাভাবিকীকরণের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

যদি প্রশ্ন করা হয়, একজন মানুষের জীবনে সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত কোনটি? বিবেকের আয়নায় হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর ভেসে উঠবে, সেই মুহূর্ত, যখন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো মাটির নিচে নামিয়ে দিতে হয় নিজের আপনজনকে।

কিন্তু, বাস্তবতার সেই ক্লান্তিলগ্নে যদি পরিবারেরই একজন সদস্য আটকে থাকেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে? তখন বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে এক গভীর প্রশ্ন, আইনের শাস্তি কি একজন মানুষকে তার পরিবারের শেষ বিদায়টুকু থেকেও বঞ্চিত করতে পারে? নাকি আইনের কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষমতার নির্মমতা, প্রতিহিংসার ছায়া কিংবা এক হিংসাত্মক অপরাজনীতির নির্মম মোড়ল?

শেষ বিদায়ে বন্দিত্বের শিকল

এমনই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে স্মৃতির আয়নায়। সময় ২০১৮ সাল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোট ভাই আলহাজ্জ্ব হুমায়ুন কবির সাঈদী মারা যান। কিন্তু, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার অন্ধ বড়াইয়ে সাঈদীকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে, ছোট ভাইয়ের জানাজায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়নি।

আশা ছিল, হয়তো শেষবারের মতো ভাইয়ের মুখ দেখবেন। হয়তো পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে জানাজার কাতারে শরিক হবেন। সেই আশাতেই জানাজার সময়ও পিছিয়ে রাখা হয়েছিল। অপেক্ষার প্রহর গুনেছিল পরিবার। হয়তো শেষ মুহূর্তে খুলে যাবে বন্দিত্বের দরজা, মানবিকতার কাছে নতি স্বীকার করবে কঠোরতার দেয়াল, এমন প্রত্যাশাই ছিল স্বজনদের।

কিন্তু, সংশ্লিষ্ট মহল থেকে আশার মিথ্যা আলো দেখানো হলেও শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়েছিল হতাশায়। জানাজার কাতারে দাঁড়ানোর সুযোগ শেষ সুযোগটুকুও হয়নি। একটি পরিবারের শোকের সঙ্গে তখন যেন যুক্ত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কঠোরতার আরেকটি দীর্ঘশ্বাস।

এ ঘটনা কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়। জামায়াত-বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীর সঙ্গেও ফ্যাসিস্ট সরকারের এমন আচরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে কারো বাবা, কারো মা, আবার কারো সন্তান, আপনজনের শেষ মুখটুকুও দেখতে পারেননি তারা। আবার দুই-একজনকে, সেই সুযোগ দেয়া হলেও, পরা থাকতো হাতকড়া কিংবা ডাণ্ডাবেড়ি।

জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইবরাহিম কবির মিঠুর বাবা মারা গেলে মানবিকতার শেষ দরজাটুকুও বন্ধ করে দিয়েছিল সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকার। বাবার শেষ বিদায়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন করা হলেও, আওয়ামী লীগ সরকার সেই আবেদন মঞ্জুর করেনি। ফলে শেষবারের মতো বাবার মুখটুকু না দেখেই বুকের ভেতর এক অদৃশ্য চাপ, এক অসহনীয় শোক এবং এক অপূর্ণতার বোঝা বহন করতে হয়েছে তাকে।

রাজনীতির প্রতিহিংসা থেকে মানবিকতার পথে বর্তমান বাংলাদেশ

সময় বদলেছে। সরকারও বদলেছে। রাজনৈতিক বাস্তবতার মোড় ঘুরেছে। গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট সরকার যে অমানবিকতার নির্মম ইতিহাস রচনা করেছে, বিশ্লেষকদের মতে সেই ধারা থেকে বের হয়ে সম্পূর্ণ মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সরকার।

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের হত্যা মামলায় পৃথক কারাগারে বন্দি শাকিল-রূপা দম্পতিকে ময়মনসিংহে, রুপার মা হোসনে আরা বেগমের জানাজায় যোগ দেয়ার জন্য সাময়িক মুক্তি দেয়া হয়।

এছাড়া, স্বামীকে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ও গণহত্যার দোসর হিসেবে সমালোচিত দিপু মনিকে ১২ ঘণ্টার জন্য প্যারোলে মুক্তির বিষয়টিও দেশজুড়ে তুমুল আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের সরকার গত ১৭ বছরের হিংসাত্মক রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হয়ে শুরু করেছে এক নতুন মানবিক রাজনীতির ধারা। তাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রের হাতে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা যেমন রয়েছে, তেমনি সেই ক্ষমতার প্রয়োগে মানবিকতার ভারসাম্য রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

অপরাধ স্বাভাবিকীকরণের অভিযোগ

তবে, মানবিক কারণে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট স্বৈরাচারদের, বর্তমান সরকার এসব সুযোগ দিলেও, একটা শ্রেণীর বিরুদ্ধে এমন অপরাধীদের পক্ষে সাফাই গাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গণহত্যা এবং জুলুম-অত্যাচার চালানো, এসব মানুষদের অপরাধকেও, সুযোগে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে, স্বাভাবিকীকরণের চেষ্টা করছে একটি চক্র, রয়েছে এমন সমালোচনাও।

এসবের মাঝেই, বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তেমনই একটি পোস্ট থেকে জানা যায়, জামায়াত নেতা মরহুম কাদের মোল্লার মেয়ে আমাতুল্লাহ শারমীন অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে পক্ষপাতদুষ্ট মিডিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তাঁর বাবার মৃত্যুর দিন পুলিশ তাঁর দুই ভাইসহ পরিবারের ১১ জনকে চরম নিষ্ঠুরতায় আটক করেছিল। অথচ, দীপু মনিদের মতো মানুষের জন্য এই মূর্খ ও চাটুকারী মিডিয়াগুলোর নির্লজ্জ মায়াকান্না দেখে জাতি আজ হতবাক।

কাদের মোল্লার মেয়ে, বেদনাহত কণ্ঠে জানান, সেদিন তাঁর বাবাকে শুধু মেরেই ফেলা হয়নি, বরং বেহায়া ছাত্রলীগ তাঁদের পুরো পরিবারের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছিল।

বিশ্লেষকদের দাবি, কারাগারের দেয়াল একজন মানুষের অনেক স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু তার রক্তের সম্পর্ক, তার শোক, তার ভালোবাসা কিংবা আপনজনকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর আকুতিকে তো বন্দি করে রাখতে পারে না। আবার, মানবিক এসব সুযোগের ব্যবহার করে, কোনো অপরাধীর পক্ষে সাফাই গাওয়া কিংবা বয়ান উৎপাদন করাও উচিত নয় বলে, মত তাদের।



banner close
banner close