শেখ মুজিবুর রহমান-বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিতর্কিত অধ্যায়ের নাম। যার পাতায় পাতায়, প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছে এমন এক উপাখ্যান, যার পরতে পরতে আজও জমে আছে ধোঁয়াশার কালো মেঘ। আর সেই ধোঁয়াশাকে ঘিরেই নির্মিত হয়েছে এমন কিছু রূপকথার গল্প, যার কল্পকাহিনির প্রধান রচয়িতা ছিলেন লেডি ডন খ্যাত ফ্যাসিস্ট কন্যা শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১-একটি আত্মত্যাগ, আত্মনিবেদন আর আত্মবিসর্জনের অধ্যায়। রক্ত, অশ্রু আর অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগে লেখা সেই ইতিহাস। কিন্তু গত ১৭ বছরে সেই ইতিহাসের একক মহানায়ক ও রূপকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হয়েছে তাঁর কথিত গৌরবগাথার একরৈখিক বয়ান।
১৯৭২-৭৫ এর নীরবতা
গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের শাসনামলে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ১৯৭১ এবং তার আগের ইতিহাসকে রাজনৈতিক বয়ান ও ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর সেই সাড়ে তিন বছরের ইতিহাসে তিনি বরাবরই সাইলেন্ট মোডে ছিলেন। যেন ইতিহাসের সেই অধ্যায়ের দরজায় পৌঁছাতেই নেমে আসত এক অদৃশ্য পর্দা। প্রশ্ন দাঁড়ায়-কেন সেই অধ্যায়ের কথা বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে নেমে আসত এমন এক অজানা নীরবতা?
ঐতিহাসিক সূত্র বলছে, ১৯৭২-৭৫-এর সময়ের বাংলাদেশ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, দুর্ভিক্ষ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, বিরোধী মতের সঙ্গে সংঘাত, রক্ষীবাহিনীকে ঘিরে নানা বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত একদলীয় শাসনব্যবস্থা, বাকশাল কায়েমের অপচেষ্টায় উত্তাল।
অভিযোগ রয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞ এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ দুর্ভোগে জর্জরিত বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ফিরে এসে দেশকে সুসংগঠিত করার বদলে নিজের একনায়কতন্ত্র, বাকশাল কায়েমের রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন।
১৯৭৩ সালের নির্বাচন ও কারচুপি
১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করেন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সংবিধানের আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের নির্বাচনী কাজে রাষ্ট্রীয় হেলিকপ্টারে পুরো দেশ চষে বেড়িয়েছেন শেখ মুজিবুর রহমান।
তথ্য বলছে, গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট সম্রাজ্ঞী শেখ হাসিনা রাতের আঁধারে কালো ভোটের কারবারি করে নির্বাচনে জিতে এসেছেন। সমালোচকদের মতে, শেখ হাসিনার এই কালো ভোটের কারবারি নতুন কোনো গল্প নয়; বরং এই বিতর্কিত উপাখ্যানের শুরু হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই, তাঁর হাত ধরেই।
১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের দল আওয়ামী লীগ সারা দেশে ভোটের কারচুপি করেছে-এমন অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা অনেক প্রার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্বাচনে আসতেই দেননি বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে আসে।
খন্দকার মোশতাককে জেতাতে শেখ মুজিবুর রহমান কুমিল্লায় হেলিকপ্টার পাঠিয়ে ভোটের বাক্স উঠিয়ে নিয়ে আসারও বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে। তথ্য বলছে, সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসনে জয়লাভ করে, যার অধিকাংশই ছিল কারচুপিতে জেতা। এই পুরো ভোট কারচুপিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে রক্ষীবাহিনী।
রক্ষীবাহিনী ও দমন
রাজনৈতিক বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শেখ মুজিবুর রহমান এই রক্ষীবাহিনীকে গঠনই করেছিলেন নিজের শেষ না হওয়া রাজত্বের একনায়কতন্ত্র এবং বাকশাল কায়েমের স্লোগানকে সামনে রেখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৭ বছরে শেখ হাসিনা যেমন পুলিশ বাহিনীকে তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহার করেছেন, সেই সময় রক্ষীবাহিনীকেও বিরোধী মত দমন করতে গঠন করা হয়। শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠা সিরাজ শিকদারকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে এই রক্ষীবাহিনীর বিরুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা অপারেশনের অগ্রনায়ক সিরাজ শিকদার তাঁর ভারতবিরোধী মনোভাবের কারণে অল্পতেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলেন বলে জানা যায়। আর তাঁর ভারতবিরোধী মনোভাবকে শেখ মুজিব নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ দেখছিলেন বিধায় রক্ষীবাহিনীর হাতে তাঁকে হত্যা করার অভিযোগ রয়েছে।
সে সময় নির্বাচনের কারচুপির মধ্য দিয়ে দেশে কায়েম হয় একনায়কতন্ত্র, স্বৈরশাসন-এমনই দাবি করা হয়েছে বিভিন্ন সময়। তথ্য মতে, নির্বাচনের ঠিক পরপরই দেশে দেখা দেয় চরম দুর্ভিক্ষ। আর সেই দুর্ভিক্ষে লাশের সারি দীর্ঘ হয়ে যায় প্রতিটি প্রান্তে। ক্ষুধার্ত মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে বাতাস, আর শূন্য হাঁড়ির শব্দ যেন হয়ে ওঠে সময়ের নির্মম প্রতিচ্ছবি।
দুর্ভিক্ষ ও দুর্নীতি
এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ মুজিব সরকারের চরম দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা ডেকে এনেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রের বর্ণনায় দাবি করা হয়। এছাড়াও সে সময় শেখ কামালের বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগও ওঠে এবং পুলিশ তাঁর গাড়িকে ধাওয়া করে গুলি পর্যন্ত করেছিল বলে জানা যায়।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান অর্থনীতি স্থিতিশীল করা নিয়ে কাজ না করে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন। আর দেশের মানুষ যখন চরম দুর্ভিক্ষে, তখন শেখ পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিন্তে আমোদ-আহ্লাদ করে গিয়েছে বলে বিভিন্ন বর্ণনায় জানা যায়।
বাকশাল কায়েম
আর এসব নানান অনিয়ম আর দুর্নীতি চলার মধ্য দিয়েই শেখ মুজিব তাঁর ক্ষমতাকে আরও স্থায়ী করতে সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দল ভেঙে দিয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল নামে জাতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করেন বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি।
সূত্র জানায়, ঐতিহাসিক সেই বাকশাল কার্যকর করার জন্য দেশে চারটি পত্রিকা ছাড়া সমস্ত পত্রিকা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়। সে সময় দেশে কোনো বিরোধী দলও ছিল না বলে জানা যায় একাধিক সূত্র থেকে। আর শেখ মুজিবুর রহমানের এই স্বৈরতন্ত্রের ইতিহাসের ইঙ্গিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছ থেকেও পাওয়া যায়।
মাহমুদুর রহমান, সম্পাদক, দৈনিক আমার দেশ
ক্ষমতার একক কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান জনমনে সৃষ্টি করেছিলেন চরম অসন্তোষ। আর এরই ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও জন্ম নেয় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
অনেকের মতে, শেখ মুজিবুর রহমানের এই একদলীয় শাসনের ভয়ংকর পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেই একদল সেনা অফিসার শেখ মুজিবকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ফলে সেই চৌকস সেনাবাহিনীর একাংশের নেতৃত্বে শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার দিন দেশের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক ছিল। কোথাও বড় ধরনের ভাঙচুর কিংবা সহিংসতার ঘটনা দেখা তো যায়নি। বরং আনন্দ প্রকাশ করতে অনেক মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতেও দেখা গিয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী আমলে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে তাঁকে একজন মহানায়ক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, তিনি মহানায়ক নন; বরং খলনায়কই ছিলেন। আর তাঁর এই মহানায়কের আড়ালে থাকা দুর্নীতি, লুটতরাজ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ তাঁর খলনায়কসুলভ চরিত্রকে আড়াল করার জন্যই তাঁকে জাতির জনক উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এবং দেশজুড়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাঁকে নিয়ে পরিচালিত হয় অতিরঞ্জন, আবেগনির্ভর প্রচারণা এবং নানা মাত্রার বাড়াবাড়ি।
আরও পড়ুন:








