বৃহস্পতিবার

২০ আগস্ট, ২০২৬ ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩

ইসলামপন্থী জিয়া পরিবার আর ইসলামবিদ্বেষী শেখ পরিবার

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ২১:৫০

শেয়ার

ইসলামপন্থী জিয়া পরিবার আর ইসলামবিদ্বেষী শেখ পরিবার
ছবি বাংলা এডিশন

শেখ ও জিয়া পরিবার-বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুল আলোচিত দুটি নাম। একই ইতিহাসের পাতায় তাদের উপস্থিতি থাকলেও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, আদর্শিক অবস্থান এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রশ্নে দুই পরিবারের গল্পকে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করে বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, বাংলাদেশের ইসলামিক সংস্কৃতি ও মুসলিম জাতীয়তাবাদের আলোচনায় জিয়া পরিবারের অবদান বারবার ফিরে আসে দেশের ইতিহাসের নানা অধ্যায়ে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের আরেক আলোচিত রাজনৈতিক পরিবার শেখ পরিবার, বরাবরই ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের কারণে সমালোচিত।

তারেক রহমানের পদক্ষেপ ও জিয়ার আদর্শ

সম্প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি সিদ্ধান্ত নতুন করে দুই পরিবারের ভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানের আলোচনাকে সামনে নিয়ে এসেছে। জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদের ১৩তম অধিবেশন শুরুর ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে স্পিকারের আসনের পেছনের দেয়ালে আরবি ক্যালিগ্রাফিতে 'লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' স্থাপন করা হয়।

সংবিধানে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' পুনঃস্থাপনের কথা উল্লেখ করে তিনি যেন ফিরে তাকিয়েছেন তার পিতা শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের দিকে। তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে যুক্ত হয় 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম'। একই সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' সংযোজন করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের নথিতেও এসব সাংবিধানিক পরিবর্তনের ইতিহাস উল্লেখ রয়েছে।

শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, ইসলামী শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের বিষয়টি আলোচনায় আসে। জানা যায়, ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং তার শাসনামলেই এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে এ-সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হয় বলে জানা যায়।

খালেদা জিয়ার ইসলামপন্থী সম্পর্ক

অপরদিকে, বিভিন্ন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্যেও শহীদ জিয়াউর রহমানের ইসলামিক সাংস্কৃতিক আবহে অবদানের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিভিন্ন বক্তব্যেও এ বিষয়ে মতামত পাওয়া যায়।

তথ্য অনুযায়ী, দেশের সংস্কৃতিতে সেই ইসলামিক ভাবধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান বেগম খালেদা জিয়া। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্কও ছিল প্রকাশ্য। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত চারদলীয় জোট সরকারের অন্যতম শরিক ছিল জামায়াতে ইসলামী। দলটির দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হন। এছাড়াও ফ্যাসিবাদী আমলে জামায়াতের নেতাদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক শুধু নির্বাচনী মঞ্চে সীমাবদ্ধ ছিল না; রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও এর প্রতিফলন ঘটেছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করে।

অপরদিকে, খালেদা জিয়ার সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন উদ্যোগ সামনে আসে। ফাজিল ও কামিল সনদের উচ্চশিক্ষার সমমান প্রদানের উদ্যোগকে তার সমর্থকেরা ধর্মীয় শিক্ষার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

আলেম-ওলামা ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতাও ছিল দৃশ্যমান। ২০১৩ সালের শাহবাগ ও হেফাজত-সংক্রান্ত রাজনীতিতে তার অবস্থান তাকে ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর একটি অংশের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের বিভিন্ন বক্তব্যেও এ প্রসঙ্গ আলোচিত হয়েছে।

অন্যদিকে, হিন্দুত্ববাদী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নেও বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল একেবারে সুস্পষ্ট। তার সমর্থকেরা এটিকে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান হিসেবে তুলে ধরে থাকে।

শেখ পরিবারের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমালোচনা

একদিকে, শহীদ জিয়াউর রহমান সংবিধানে 'বিসমিল্লাহ' এবং 'সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' সংযোজনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে সমর্থকদের মধ্যে প্রশংসা রয়েছে। অন্যদিকে, শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রণীত প্রথম সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক বিদ্যমান। এছাড়াও, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রবর্তিত বাকশাল ব্যবস্থার আদলে একদলীয় শাসন কায়েম করা হয়েছিল।

অভিযোগ রয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানের বাকশালের সেই ধারাকেই গত ১৭ বছরে আরও এগিয়ে নিয়ে গণতন্ত্রের আড়ালে লুকিয়ে থাকা একচ্ছত্র ক্ষমতার এক রাজনৈতিক কাঠামো কায়েমের অপচেষ্টা চালিয়েছেন শেখ হাসিনার সরকার।

সমালোচনা রয়েছে, শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে নিজেকে খাঁটি মুসলিম হিসেবে জাহির করলেও ধর্মের সেই আবরণের আড়ালে নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিলেন ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের এক মহাসমুদ্র। তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় ২০০২ সালে ক্রিস্টিন অ্যান ওভারমায়ার নামের এক খ্রিষ্টান তরুণীকে বিয়ে করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমালোচনা হলে সংসদে খ্রিষ্টানদের, মুসলমানদের ‘আহলে কিতাব’ হিসেবে উল্লেখ করে, ছেলের খ্রিষ্টান তরুণীকে বিয়ে করার বিষয়টি, ইসলাম নিয়ে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে, হালকা করার অপচেষ্টা করেছিলেন বলেও সমালোচনা রয়েছে।

অপরদিকে, নিজেকে ধর্মের মিথ্যা চাদরে আবৃত রাখলেও ভেতরে ভেতরে মুসলমানদের প্রতি তার বিরূপ মনোভাব ছিল—এমন দাবি উঠে এসেছে মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান রেন্টুর আমার ফাঁসি চাই বইয়ে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনা মুসলমানদের অকৃতজ্ঞ ও বেঈমান হিসেবে দেখতেন এবং নির্বাচনী কৌশলের প্রয়োজনে মুখে হাদিসের বুলি আওড়াতেন।

এছাড়াও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেকে পাক্কা নামাজি হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে তিনি নামাজই পড়তেন না বলেও জানা গেছে। অপরদিকে নামাজি ব্যক্তিদের প্রতি তার চরম বিদ্বেষ ছিল—এমন দাবিও বিভিন্ন সূত্র ও বর্ণনায় উঠে এসেছে।

শেখ হাসিনা এতটাই ইসলামবিরোধী ছিলেন যে আদর্শগত ভিন্নতা ও মতাদর্শের কারণে ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি তার বিরূপতা তৈরি হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থকে সন্তুষ্ট রাখতে ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ ১৭ বছরের কালো অধ্যায়ে বিভিন্ন সময়ে জঙ্গিবাদের নাটক সাজিয়ে বিরোধী মতের মানুষকে জেলে ঢোকানো, নির্যাতন ও নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। তাদের ভাষায়, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতাকেই রাষ্ট্রীয় দমননীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

এছাড়াও, সমালোচকদের নানা বক্তব্য ও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, ব্যক্তিজীবনে শেখ হাসিনার একাধিক পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক ছিল। এসব অভিযোগ ও গুঞ্জনকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা বিতর্ক। এমনকি হিন্দু যুবক মৃণাল কান্তি দাসের সঙ্গে শেখ হাসিনার শারীরিক সম্পর্কের গুঞ্জন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ইসলামী চিন্তাধারা ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে শেখ হাসিনা ও তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ উপেক্ষা করেছে—এমন অভিযোগ রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় এসে বিএনপির তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার, সেই ধারা থেকে বেরিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ওপরই রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

একদিকে জিয়া পরিবার—যাদের রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে ইসলাম, মুসলিম সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্পর্কের কথা তাদের সমর্থকেরা বারবার তুলে ধরে। অন্যদিকে শেখ পরিবার—যাদের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ঐতিহাসিকভাবে ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলামবিদ্বেষ রাষ্ট্রচিন্তা।

দুটি পরিবার—দুটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। একই ভূখণ্ডের রাজনীতিতে পাশাপাশি উচ্চারিত হলেও তাদের আদর্শিক পথ যেন দুই ভিন্ন স্রোত। একদিকে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়ানো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, অন্যদিকে ইসলামবিদ্বেষী রাষ্ট্রচিন্তার উত্তরাধিকার, জিয়া ও শেখ পরিবারকে রেখেছে ইতিহাসের ভিন্ন দুই প্রান্তে। যেখানে, আস্থা, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় যোজন যোজন এগিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরিরা।



banner close
banner close