বুধবার

১৯ আগস্ট, ২০২৬ ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩

হাসিনার আত্মীয়রা সবাই পালিয়েছে ধরা খেয়েছেন শুধু একজন!

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:২১

আপডেট: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১৯:২২

শেয়ার

হাসিনার আত্মীয়রা সবাই পালিয়েছে ধরা খেয়েছেন শুধু একজন!
ছবি সংগৃহীত

২০২৪ সালের সোমবার (৫ আগস্ট)। ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে টানা সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করা শেখ হাসিনা সরকারের। চারপাশের তীব্র জনরোষ ও পরিস্থিতির ভয়াবহতা টের পেয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদত্যাগের পরপরই এক সামরিক হেলিকপ্টারে করে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটি থেকে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা হন তিনি।

তবে কেবল তিনি একা নন, তার এই অন্তিম যাত্রায় সঙ্গী হন ছোট বোন শেখ রেহানা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তথা শেখ রেহানার দেবর তারিক আহমেদ সিদ্দিক। শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠদের এই আকস্মিক বিদায়ের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ একচ্ছত্র ক্ষমতার।

স্বৈরাচার শাসনে শেখ পরিবারের আধিপত্য

স্বৈরাচার শেখ হাসিনার শাসনকালের পুরো সময়জুড়েই ক্ষমতার একদম শীর্ষে অবস্থান করছিলেন তার পরিবারের সদস্য কিংবা আত্মীয় স্বজনরা। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক পদ-পদবি এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তার-সবখানেই ছিল এই পরিবারের একচ্ছত্র আধিপত্য। শেখ হাসিনার পরিবারের প্রায় দুই ডজন সদস্য কোনো না কোনোভাবে সরকার ও দলের গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাভোগী ছিলেন। কেউ ছিলেন মন্ত্রী, কেউ সংসদ সদস্য, আবার কেউ বা ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ-সংগঠনের নীতি-নির্ধারক পদের শীর্ষ আসনে।

কিন্তু, যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে এবং সরকারের পতন ঘটার উপক্রম হয়, তখন এই পরিবারের প্রভাবশালী সদস্যরা একে একে দেশ ছেড়ে নিরাপদে সরে পড়েন। জানা যায়, ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে শুরু করে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত শেখ পরিবারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই গ্রেপ্তার এড়িয়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে সক্ষম হন।

এপ্রিল-মে মাসে দেশত্যাগ

সরকারের পতন যে আসন্ন, তা হয়তো সাধারণ মানুষের অনুমানের অনেক আগেই টের পেয়েছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ব্যক্তিরা। আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধির বেশ আগেই, ২০২৪ সালের এপ্রিল ও মে মাস থেকেই শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের বিদেশ যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়।

শেখ হাসিনার অত্যন্ত প্রভাবশালী চাচাতো ভাই এবং খুলনা এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল ২০২৪ সালের (২০ মে) দেশত্যাগ করেন। এর ঠিক দু’দিন আগে, অর্থাৎ (১৮ মে) দেশ ছাড়েন হাসিনার আরেক ফুফাতো ভাই শেখ ফজলুর রহমান মারুফ। যদিও রাজনীতিতে মারুফের দৃশ্যমান সক্রিয়তা কম ছিল, তবুও সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার সুনির্দিষ্ট প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

এরও আগে, মে মাসের শুরুতেই পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পথ গুটিয়ে নেন পরিবারের অন্য সদস্যরা। এপ্রিলের মাঝামাঝি, অর্থাৎ (১৭ এপ্রিল) দেশ ছাড়েন জাতীয় সংসদের তৎকালীন চিফ হুইপ এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন। ক্ষমতার দাপটে থাকা এসব নেতারা আন্দোলন চরম রূপ নেয়ার আগেই কৌশলে নিজেদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হন।

জুন মাসেও থামেনি পলায়ন

জুন মাসে পদত্যাগের চাপ কিংবা কোটা আন্দোলনের দৃশ্যমান স্ফুলিঙ্গ অতটা দাউ দাউ করে না জ্বললেও, শেখ পরিবারের সদস্যদের বিদেশ গমনের গতি থামেনি।

(৪ জুন) দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাই শেখ হেলালের ছেলে ও বাগেরহাটের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ তন্ময়। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে থাকা তরুণ এই নেতা বৈরিক পরিস্থিতির পূর্বাভাস পেয়েই দেশ ছেড়ে যান।

ব্যবসা ও রাজনীতির মেলবন্ধনে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা শেখ সেলিমের দুই ছেলেও জুনের মাঝামাঝি সময়ে দেশ ছাড়েন। এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম (১৩ জুন) এবং তার ভাই, যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলে নাঈম (১৪ জুন) দেশ ত্যাগ করেন। জানা গেছে পরবর্তীতে, শেখ ফজলে নাঈম ভারতে গিয়ে অবস্থান নেন এবং সেখান থেকেই নিয়মিত যুবলীগের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন।

একই মাসে দেশ ছাড়েন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। (২০ জুন) তিনি থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন’ বা সিআরআই-এর দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা ববি দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। তার স্ত্রী ফিনল্যান্ডের নাগরিক হওয়ায় এবং বিদেশে দীর্ঘ অবস্থানের সুবাদে তিনিও দেশের বাইরে নিজেকে নিরাপদ রাখেন।

যুবলীগের চেয়ারম্যান এবং শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ (২৫ জুন) দেশ ছাড়েন। যদিও তিনি পরবর্তীতে সরকার পতনের ঠিক আগের সপ্তাহে কানাডা থেকে পুনরায় দেশে এসেছিলেন এবং আন্দোলন প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তবে (৫ আগস্ট)-এর পর তিনি প্রথমে কানাডা ও পরবর্তীতে ভারতে গিয়ে আত্মগোপন করেন।

জুলাইয়ে তীব্র হয় দেশ ছাড়ার হিড়িক

জুলাই মাস নাগাদ কোটা সংস্কার আন্দোলন একটি পূর্ণাঙ্গ গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সরকারের কঠোর অবস্থান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বলপ্রয়োগের মুখে যখন রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই শেখ পরিবারের আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম এবং আরেক প্রভাবশালী ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ জুলাইয়ের শুরুতেই নিজেদের পথ আলাদা করে নেন। (৫ জুলাই) দেশ ছাড়েন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং (৬ জুলাই) দেশ ছাড়েন শেখ সেলিম ও তার আরেক ভাই শেখ সোহেল।

আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল অঞ্চলের রাজনীতি একচ্ছত্রভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। ভারতের রাজস্থানে নিজ মেয়ের বসতি ও ব্যবসায়িক সোর্সের সুযোগ নিয়ে তিনি শুরুতেই সেখানে পাড়ি জমান। অন্যদিকে শেখ সেলিম পরবর্তীতে কলকাতার অভিজাত এলাকায় অবস্থান নেন বলে জানা যায়।

(১২ জুলাই) দেশ ছাড়েন সাবেক এমপি শেখ হেলাল উদ্দীন এবং (১৪ জুলাই) দেশ ছাড়েন ফরিদপুরের আলোচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ও যুবলীগ নেতা মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। আন্দোলনের মাত্রা যত বাড়ছিল, শেখ পরিবারের সদস্যরা ততটাই তড়িঘড়ি করে ইমিগ্রেশন পার হচ্ছিলেন। ফলে আন্দোলন যখন আগস্টের প্রথমার্ধে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন শেখ পরিবারের প্রায় সকল শীর্ষ সদস্যই ছিলেন দেশের সীমানার বাইরে নিরাপদ আশ্রয়ে।

নির্দেশক পরিবারের সদস্যরা

শেখ হাসিনার নির্দেশক ও প্রত্যক্ষ পরিবারের সদস্যরা অবশ্য আগে থেকেই আন্তর্জাতিকভাবে সুসংগঠিত অবস্থানে ছিলেন।

শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বহু বছর ধরেই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সরকারের মেয়াদকালে তিনি নিয়মিত দেশে আসতেন এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কার্যক্রমে অংশ নিতেন। ২০২৪ সালের (১৮ এপ্রিল) তিনি দেশ ছাড়েন এবং পতনকালজুড়ে ওয়াশিংটনেই অবস্থান করেন।

শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল ২০২৩ সালের নভেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও’র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক নির্বাচিত হন। তার কর্মস্থল ছিল ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। (১২ জুলাই) বাংলাদেশ ছাড়ার পর তিনি মূলত দিল্লিতেই অবস্থান করছিলেন। পতন পরবর্তী পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের এই অঙ্গসংগঠন তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠালেও তিনি সবেতন পদে বহাল থাকেন এবং ভারত ও দুবাইয়ে যাতায়াত বজায় রাখেন।

অন্যদিকে, শেখ রেহানার দুই মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক ও আজমিনা সিদ্দিক রূপন্তী জন্মসূত্রে ও নাগরিকত্বে যুক্ত রাজ্যের অধিবাসী। টিউলিপ সিদ্দিক ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একজন সাবেক সদস্য হিসেবে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। ছোট মেয়ে রূপন্তী রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও তিনি যুক্তরাজ্যেই থাকেন। সরকার পতনের মাত্র দু’দিন আগে শেখ রেহানা লন্ডন থেকে ঢাকায় এলেও (৫ আগস্ট) শেখ হাসিনার সঙ্গেই পুনরায় দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

তাপসের নাটকীয় পলায়ন

শেখ পরিবারের নিরবচ্ছিন্ন দেশত্যাগের ঘটনায় সবচেয়ে নাটকীয় মোড় উন্মোচিত হয় (৩ আগস্ট) সকালে। ততদিনে রাজপথে আন্দোলনের গতিবেগ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উপস্থিত হন দেশ ছাড়ার উদ্দেশ্যে।

তবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে আটকে দিলে তাপস সরাসরি শেখ হাসিনাকে ফোন করেন। সকাল ৮টা ১৬ মিনিটে হওয়া ওই ফোনালাপে তাপস অত্যন্ত আকুল হয়ে শেখ হাসিনার কাছ থেকে অনুমতি নেন।

হাসিনার সাথে তাপসের ফোনালাপের ঠিক আগের দিন এবং পালানোর দিন আন্দোলনজুড়ে ঝরে গিয়েছিল শত শত প্রাণ। (৩ আগস্ট) বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়। সারা দেশ যখন দ্রোহযাত্রা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে উত্তাল, সেনা দরবারে যখন সাধারণ মানুষের ওপর গুলি না চালানোর মতামত উঠে আসছে, ঠিক তখনই সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি তাপস নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে গোপনে দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সফলভাবে দেশ ছাড়তে সমর্থ হন।

আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত পার

শেখ পরিবারের এই ক্ষমতার প্রভাব কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; পুরো দেশজুড়ে তাদের স্বজনেরা আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, বরিশাল অঞ্চলটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ এবং তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ।

আবুল হাসানাত ছিলেন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহ ছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিটি মেয়র। বাবা-ছেলে মিলে পুরো অঞ্চলের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। আন্দোলন দমনেও তারা ছিলেন প্রথম সারিতে। তবে পতন নিশ্চিত হতেই হাসানাত ভারতে পাড়ি জমান এবং পরবর্তীতে তার ছেলে সাদিক আবদুল্লাহও ভারত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। (৫ আগস্ট)-এর পর বিক্ষুব্ধ জনতা বরিশালে তাদের বাসভবনে অগ্নিসংযোগ করে, তাদের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের ইতি ঘটায়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় একতরফা ও বিতর্কিত ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে শেখ হাসিনাসহ তার নিজ পরিবারের আটজন সদস্য সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তাদের মধ্যে, শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, সম্পর্কে হাসিনার ফুফাতো ভাই। শেখ হেলাল উদ্দীন ও শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল সম্পর্কে হাসিনার চাচাতো ভাই, শেখ তন্ময় শেখ হেলালের ছেলে। নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন সম্পর্কে ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে। মজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন হাসিনার ফুফাতো ভাইয়ের ছেলে।

জনগণের ভোটের তোয়াক্কা না করে অর্জিত এই বিপুল রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে, পতনকালে তারা অত্যন্ত নিরাপদে সীমান্ত পার হতে সক্ষম হন। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক সোর্স এবং বিপুল অংকের অর্থের বিনিময়ে সাতক্ষীরা, সিলেট ও ময়মনসিংহের সীমান্ত পথ ব্যবহার করে তারা ভারতে পৌঁছান। কলকাতার নিউ টাউনসহ বিভিন্ন বিলাসবহুল আবাসিক এলাকায় তারা বর্তমানে বসবাস করছেন বলে একাধিক মাধ্যম থেকে জানা গেছে।

একমাত্র গ্রেপ্তার ও তৃণমূলের ক্ষোভ

শেখ পরিবারের সদস্যরা বিপুল অর্থ ও প্রশাসনিক সুবিধা ব্যবহার করে নিরাপদে দেশ ছাড়লেও বিপরীত চিত্র দেখা গেছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের ক্ষেত্রে। সরকার পতনের পর একে একে গ্রেপ্তার হন দলের তিন ডজনের বেশি সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং ৫০ জনেরও বেশি সংসদ সদস্য। বর্তমানে কারাগারে বন্দি রয়েছেন সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক, জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক, কাজী জাফর উল্যাহ, আব্দুর রাজ্জাক, শাহজাহান খান ও ফারুক খানের মতো শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা। জেলে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন এবং সিনিয়র নেতা মতিয়া চৌধুরী।

পুরো শেখ পরিবারের মধ্যে কেবল একজন সদস্য, আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর ছেলে মঈন উদ্দিন আবদুল্লাহ ঢাকায় গ্রেপ্তার হন, যিনি মূলত রাজনীতির বাইরে সাধারণ ব্যবসায়ে নিয়োজিত ছিলেন। পরিবারের মূল চালিকাশক্তির সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের সুবিধাবঞ্চিত নেতাকর্মীদের মধ্যে মারাত্মক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, বিপদকালে দলীয় কর্মীদের ‘কামানের গোলা’ হিসেবে ব্যবহার করে শীর্ষ পরিবার নিজেরা নিরাপদে সটকে পড়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে শেখ হাসিনার রাজনীতির প্রধান দুটি চালিকাশক্তি ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা এবং জ্ঞাতি-গোষ্ঠীপ্রীতি। সাড়ে ১৫ বছরে সরকার পরিচালন ব্যবস্থা একটি পারিবারিক সংস্থায় রূপ নিয়েছিল। ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি সাধারণ নেতাকর্মীদের চরম ঝুঁকিতে ফেলে শুধু নিজের পরিবার ও স্বজনদের নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করেছেন। এতে প্রমাণিত হয়, দীর্ঘ শাসনামলে সাধারণ কর্মীরা কেবল বলির পাঁঠা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে।

রাজনৈতিক ক্ষমতার এমন অপব্যবহার এবং বাকী সবাইকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পরিবারকে রক্ষা করার এই ইতিহাস, বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক চরম শিক্ষা হিসেবে লেখা থাকবে।



banner close
banner close